মুদ্রাকে বাণিজ্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে না

Print Friendly, PDF & Email

আইএমএফ সম্মেলনে সদস্যভুক্ত দেশগুলোর অঙ্গীকার

প্রতিযোগিতামূলকভাবে মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সদস্য দেশগুলো। বাণিজ্য নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিরোধ ও উচ্চসুদের হারের কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়ায় নিজেদের মধ্যে আলোচনায় আরো গতি আনার বিষয়েও একমত হয়েছে তারা। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে আইএমএফের ছয় দিনব্যাপী সম্মেলন শেষে দেয়া বিবৃতিতে এসব কথা জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল কমিটি (আইএমএফসি)। খবর রয়টার্স ও এএফপি।

মার্কিন ডলারের বিপরীতে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়া চীনের স্থানীয় মুদ্রা ইউয়ান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্টিভ মানিউচিন উদ্বেগ প্রকাশ করার পরই আইএমএফ সদস্যরা এ ঐকমত্যে পৌঁছায়। ওয়াশিংটনের সন্দেহ রফতানিতে সুবিধা পেতে এবং মার্কিন শুল্কের প্রভাব কমিয়ে আনতেই চীন ইচ্ছাকৃতভাবে মুদ্রা অবমূল্যায়িত করছে। শুক্রবার মানিউচিন জানিয়েছেন, তিনি চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকপ্রধানের কাছে দেশটির দুর্বল স্থানীয় মুদ্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি আরো বলেন, বালিতে পিপলস ব্যাংক অব চীনের (পিবিওসি) গভর্নর ইয়ে গ্যাংয়ের সঙ্গে ‘মুদ্রা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা’ হয়েছে।

সিএনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে মানিউচিন বলেন, ‘আমি মুদ্রার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা তাদের কাছে প্রকাশ করেছি।’ চীনের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, তারাও মুদ্রার আর অবমূল্যায়ন দেখতে চান না। ‘আমরা চীনকে স্পষ্ট করে বলেছি, আমাদের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য সম্পর্ক দাঁড় করাতে হবে, যার সুবাদে উভয়পক্ষের রফতানি বেড়ে যাবে।’ দুই দেশের মধ্যে যেকোনো চুক্তিতে মুদ্রার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলেও আভাস দিয়েছেন তিনি।

আইএমএফের পরিচালনা কমিটি আইএমএফসির ইশতেহারে বাণিজ্য বিরোধ হ্রাসে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) যাতে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেজন্য সংস্থাটিকে আরো কার্যকর করে তোলার উপায় বের করতে আলোচনার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা সবাই জানি মুক্ত, অবাধ, পারস্পরিক সুবিধাযুক্ত পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের সঙ্গে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সরাসরি সম্পর্কিত। আমরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে মুদ্রার অবমূল্যায়ন থেকে বিরত থাকব এবং বাণিজ্যে সুবিধা পেতে কখনই আমাদের মুদ্রার বিনিময় হারকে নিশানা হিসেবে ব্যবহার করব না।’

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে চলমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দেবে এ ধরনের আশঙ্কায় বিগত কয়েক দিন শেয়ারবাজারে চরম দরপতন লক্ষ করা গেছে। এ পরিস্থিতিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থিত আর্থিক খাতের নেতারা ঝুঁকি বৃদ্ধি নিয়ে সতর্কবাণী দিয়েছেন। শুল্কারোপের হুমকির বিষয়টি উল্লেখ করে ইশতেহারে বলা হয়, ‘অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ক্রমে অসম্ভব মনে হচ্ছে এবং আগে চিহ্নিত কিছু ঝুঁকি আংশিকভাবে রূপায়িত হয়েছে।’ বাণিজ্য বিরোধ এবং উদীয়মান বাজারগুলোর সংকটের কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে তার ট্র্যাকের মধ্যে রাখার সুযোগ ক্রমে ‘সংকুচিত’ হয়ে আসছে বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ।

সংস্থাটির পক্ষ থেকে পুনরায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য এবং মুদ্রা নিয়ে বিরোধের ‘ফল সবাইকে ভোগ করতে হবে।’

বিগত কয়েক মাসে বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পরস্পরের হাজার হাজার কোটি ডলারের আমদানি পণ্যে অতিরিক্ত শুল্কারোপ করেছে। চীনের মেধাসম্পদ চর্চা, শিল্প ভর্তুকি এবং বাণিজ্য নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ শুল্কযুদ্ধের সূচনা করেন। বিগত কয়েক মাসে ডলারের বিপরীতে ইউয়ান ৭ শতাংশ অবমূল্যায়িত হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে বিবাদ নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করছেন— বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা নিতেই চীন ইচ্ছাকৃতভাবে মুদ্রা অবমূল্যায়িত করছে। যদিও বেইজিং এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

আগামী সপ্তাহে মুদ্রা কারসাজি নিয়ে তথ্য প্রকাশ করবে যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে চীনকে মুদ্রা কারসাজিকারক হিসেবে উল্লেখ করা হবে। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া নভেম্বরের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় জি২০ সম্মেলনে অংশ নেয়ার ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে সাক্ষাৎ হবে কিনা, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।