প্যারাডাইস পেপারসের জালে রাঘববোয়ালেরা

Print Friendly, PDF & Email

পানামা পেপারসের পর রাঘববোয়ালদের থলের বিড়াল বের করে এবার হইচই ফেলে দিয়েছে ‘প্যারাডাইজ পেপারস’। ফাঁস হয়েছে বিশ্বের অনেক ক্ষমতাধর অনেক ব্যক্তির গোপন তথ্য। ১২০ জন রাজনৈতিক নেতা এ তালিকায় রয়েছেন। এবার ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর মতো ব্যক্তির নাম রয়েছে।

বেশির ভাগ তথ্যই বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের, যাঁরা কর থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন ট্যাক্স হেভেনে (কর দিতে হয় না কিংবা খুবই নিম্ন হারে কর দেওয়া যায় এমন দেশ) বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তাই এই কেলেঙ্কারির নাম দেয়া হয়েছে ‘প্যারাডাইজ পেপারস’। এতে গোপনে বিপুল পরিমাণ অর্থ করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত দেশ ও অঞ্চলের অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আর এসব আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা।

গত বছর পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ঘটনা সামলাতে না সামলাতে নতুন করে এই কেলেঙ্কারি ফাঁস হলো। এবারও পানামা পেপার্সের মতো এসব নথি প্রথমে জার্মান দৈনিক সুইডয়চে সাইটংয়ের হাতে আসে। পরে সেসব নথি ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসকের (আইসিআইজে) হাতে তুলে দেয় তারা। বারমুডায় অবস্থিত অ্যাপলবাই নামের এক আইনি সহযোগী সংঘটনের গোপন নথি এসব। যার মধ্যে এক কোটি ৩৪ লাখ ডকুমেন্টস এখন তদন্ত করে দেখছে ৬৭টি দেশের ৩৮০ জন সাংবাদিক। এসব নথি পেয়েছে বিবিসি, গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের ১০০টি সংবাদমাধ্যম। ৫ নভেম্বর আইসিআইজে তাদের ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ধাক্কা এখনো সামলে নিতে পারেনি অনেক দেশ। এক বছর আগের সে কেলেঙ্কারির নাম আবারও তুলতে হয়েছে আজ। গতবারের মতোই এবারও হাটে হাঁড়ি ভেঙেছে জার্মান দৈনিক জিটডয়েচ সাইতং। বারমুডায় অবস্থিত অ্যাপলবাই নামের এক আইনি সহযোগী সংঘটনের গোপন নথি জোগাড় করে সেটা তারা দিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক সংঘটনকে (আইসিআইজে)। ৬৭টি দেশের ৩৮০ জন সাংবাদিক এক কোটি ৩৪ লাখ ডকুমেন্টস এখন তদন্ত করে দেখছেন। তদন্তে ১৮০টি দেশের নাগরিক কিংবা প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। তবে আইসিআইজে তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে, তদন্তের এখন শুরু মাত্র। তাই পুরো তথ্য পাওয়া এখনো সম্ভব নয়। ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে তারা। তবে এর মাঝেই চমকে দেওয়ার মতো কিছু তথ্য দিয়েছে বিশ্বের বড় বড় সব সংবাদমাধ্যম।

এক নজরে প্যারাডাইস পেপারস

৩৮২ তদন্ত করছেন ৬৭টি দেশের ৩৮২ জন সাংবাদিক
১২০ ১২০ জন রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনেতার নাম এসেছে
১০৪ ১.৪ টেরাবাইট তথ্য ফাঁস হয়েছে
১৯ ১৯টি ট্যাক্স হেভেন অর্থ পাচার করা হয়েছে
অর্থ পাচারে সহযোগিতাকারী দুটো প্রতিষ্ঠানের নাম জানা গেছে

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ
ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ব্যক্তিগত অর্থের প্রায় এক কোটি পাউন্ড অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগ হয়েছে। এসব অর্থে কেম্যান আইল্যান্ড ও বারমুডায় রানির নামে আলাদা তহবিল সৃষ্টি করা হয়েছে। ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব অর্থ সেখানে গেছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি রানির ব্যক্তিগত সম্পদ ৫০ কোটি পাউন্ডের বিনিয়োগ দেখভাল করে তাকে মুনাফা তুলে দেয়। ব্রাইট হাউস নামের একটি প্রতিষ্ঠানে রানির বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প
নব্বইয়ের দশকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছিলেন উইলবার রস। এ জন্য এই ব্যক্তিকে বাণিজ্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেন ট্রাম্প। বিভিন্ন নথিতে দেখা গেছে, রস এমন এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত, যারা রাশিয়ান সংস্থাকে তেল ও গ্যাস শিপিং করে। এর মাধ্যমে এক বছরেই উইলবার রস মিলিয়ন ডলার আয় করেন। তবে কথা হচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উইলবার রস জড়িত তার অংশীদার ভ্লাদিমির পুতিনের জামাই এবং আরও দুজন ব্যক্তি।

জাস্টিন ট্রুডো
কানাডীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনে আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন স্টেফান ব্রনফম্যান। মাত্র দুই ঘণ্টায় ট্রুডোকে আড়াই লাখ ডলার তহবিল এনে দিয়েছিলেন ব্রনফম্যান। কিন্তু গোপন নথিতে দেখা যাচ্ছে, ব্রনফম্যান ও তাঁর প্রতিষ্ঠান কেম্যান আইল্যান্ডে প্রায় ছয় কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন। অথচ ট্রুডো বারবারই ‘অফশোর’ (কর থেকে বাঁচার জন্য বিদেশে বিনিয়োগ) বিনিয়োগের বিপক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। ট্রুডোর জন্য এটা বিরাট বড় এক ধাক্কা।

গতবার পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে লিওনেল মেসির নাম এসেছিল। এবারও ফুটবল বাদ পড়েনি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব এভারটন এফসিতে বিনিয়োগ করা বড় একটা অংশ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ ছাড়া অ্যাপল, নাইকি উবারের মতো প্রতিষ্ঠানের নামও এসেছে।

অ্যাপলবাই লিকসে যে দেশের নাগরিকদের নাম পাওয়া গেছে

অ্যাপলবাই লিকসে যে দেশের নাগরিকদের নাম পাওয়া গেছে  

তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দেশ
৩১,১৮০ যুক্তরাষ্ট্র
১৪,৪৩৪ যুক্তরাজ্য
১২,০১৭ বারমুডা
৮,৬৪০ ক্যামান আইল্যান্ডস
৭,০৬৫ হংকং
৫,৯২৪ চীন
৩,১৭৬ কানাডা
৩,০৫৪ আইল অব ম্যান
২,৩৬৩ সুইজারল্যান্ড
২,১৬৬ ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস