আগামী বছরগুলোয় বিশ্ব অর্থনীতিতে যে তিন চিত্রের দেখা মিলতে পারে

Print Friendly, PDF & Email

কয়েক বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা চলছে। বিশ্ব অর্থনীতি উন্নতির সময় (যখন প্রবৃদ্ধির অবস্থা ইতিবাচক ও শক্তিশালী) এবং পতনের সময় (যখন প্রবৃদ্ধির অবস্থা ইতিবাচক হলেও দুর্বল)— এ দুইয়ের মাঝে দুলছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে উন্নতি হওয়ার পর বিশ্ব কি আবার আরেকটি শ্লথ যুগের দিকে এগোচ্ছে কিংবা আর্থিক সংকট কাটিয়ে যে পুনরুদ্ধার ঘটেছে, তা কি অটল থাকবে?

২০১৬ সালের গ্রীষ্মের পর থেকে প্রবৃদ্ধি ও ইকুইটি বাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। এ ঊর্ধ্বগতি এখনো বহাল রয়েছে এবং আরো শক্তিশালী হচ্ছে। ব্রেক্সিট ভোটের পর স্বল্প সময়ের জন্য ধাক্কা খেলেও এ ঊর্ধ্বগতি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ই সহ্য করেনি, বরং ট্রাম্প যে ভূরাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও নীতি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন, সেটাও সামলে চলছে। এই আপাত স্থিতিস্থাপকতার প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)— যেটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি চিহ্নিত করেছে ‘নতুন মিডিওকার’ (ভালো নয়, মন্দও নয় এমন) হিসেবে— সম্প্রতি ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ হালনাগাদ করেছে।

এখন যে গতিতে প্রবৃদ্ধি এগোচ্ছে, তা কি আগামী কয়েক বছর অব্যাহত থাকবে? অথবা বিশ্ব কি এখন একটি সাময়িক চক্রাকার ঊর্ধ্বগতি দেখছে, যেটি অচিরেই পতন হবে নতুন ছায়া ঝুঁকি দ্বারা? এ ছায়া ঝুঁকিগুলো কি ওইসব ঝুঁকির মতোই, যেগুলো দ্বারা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন শ্লথ পরিস্থিতির সূচনা হয়েছিল? এ পরিস্থিতি বুঝতে হলে ২০১৫ সালের গ্রীষ্ম ও ২০১৬ সালের প্রথম দিকের অবস্থা বিবেচনা করাই যথেষ্ট। ওই সময় চীনের হার্ড ল্যান্ডিং, ইউএস ফেডারেল রিজার্ভের দ্রুত জিরো পলিসি রেট থেকে বেরিয়ে আসা, যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে স্থিতাবস্থা এবং প্রবৃদ্ধি কমানোর চক্রান্ত হিসেবে তেলের কম দাম নিয়ে ভয়ে ছিলেন বিনিয়োগকারীরা।

আগামী তিন বছর ও পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে তিনটি সম্ভাব্য চিত্র অনুমান করা যেতে পারে। ইতিবাচক চিত্র এমন হতে পারে, বিশ্বের চার সবচেয়ে বড় ও পদ্ধতিগত অর্থনীতি— চীন, ইউরো জোন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। এতে বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির গতি বাড়বে এবং আর্থিক দুর্বলতার সমাধান হবে। সংস্কার চক্রাকার ঊর্ধ্বগতির শক্তিশালী সম্ভাবনা ও প্রকৃত প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। সংস্কার আনার প্রচেষ্টা জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি করে, নিম্ন কিন্তু পরিমিতভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ায় এবং তুলনামূলকভাবে বহু বছরের জন্য আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখে। কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক ইকুইটি বাজার নতুন উচ্চতায় পৌঁঁছবে এবং অন্য ভিত্তিগুলোও শক্তিশালী হবে।

নেতিবাচক চিত্র দেখা দিলে এর বিপরীতটা ঘটবে। সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন কিন্তু যদি বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলো এটি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তবে নেতিবাচক চিত্রের দেখা মিলতে পারে। চলতি মাসের কমিউনিস্ট পার্টির ন্যাশনাল কংগ্রেসকে সংস্কারের অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করতে পারে চীন। কিন্তু চীন এটা করবে না, বরং আগের বিনিয়োগে অতিরিক্ত ঋণের অর্থ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত ধারণক্ষমতার পথেই হাঁটবে। ইউরো জোন বৃহত্তর একত্রীকরণ অর্জনে ব্যর্থ হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বাধা জাতীয় নীতিনির্ধারকদের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিকারক কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষমতা সীমিত করবে। এবং সরবরাহ-সংক্রান্ত সংস্কার ও বাণিজ্য উদারীকরণ— প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অর্থনৈতিক কৌশলের তৃতীয় তীর মুখ থুবড়ে পড়ায় জাপানের নিম্নপ্রবৃদ্ধির চক্রে আটকে থাকা অব্যাহত থাকবে।

এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন কয়েকটি নীতি পদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকবে— কর কর্তন, যা ধনীদের সুবিধা দেবে; বাণিজ্য প্রতিরক্ষাবাদ এবং অভিবাসন সীমাবদ্ধতা। এগুলো প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা ঘাটতি ও দায় হটিয়ে দেয়। এতে সুদহার বৃদ্ধি পায় এবং ডলার শক্তিশালী হয় কিন্তু প্রবৃদ্ধি দুর্বল করে দেয়। এছাড়া অস্থির মস্তিষ্কের ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারেন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলে ইরানের ওপর হামলা চালাতে পারেন। এটি আমেরিকার অর্থনীতির আগামীর সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

এ পরিস্থিতিতে প্রধান প্রধান অর্থনীতিতে সংস্কারের ঘাটতির ফলে সৃষ্ট প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি চক্রাকার ঊর্ধ্বগতিকে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে। যদি সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধিতে নিম্নগতি বজায় থাকে এবং সহজ মুদ্রানীতি ও ঋণনীতি গ্রহণ করা হয় (যেটি পণ্য বা সম্পদ মূল্যস্ফীতি ডেকে আনবে), তাহলে সৃষ্টি হবে অর্থনৈতিক শ্লথগতি। যখন সম্পদের বুদ্বুদ ফেটে যাবে অথবা মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে, তখন সম্ভবত পুরোদস্তুর আর্থিক মন্দা সৃষ্টি হবে।

তৃতীয় এবং আমার মতে যেটি ঘটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তা হলো, এমন পরিস্থিতি তৈরি, যা হবে প্রথম দুই সম্ভাবনার মাঝামাঝি। একে অনেকটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও বলা যেতে পারে। চক্রাকার ঊর্ধ্বগতি (প্রবৃদ্ধি ও ইকুইটি বাজার উভয় ক্ষেত্রে) কিছুদিন ভালো চলবে অবশিষ্ট ইতিবাচক দিকগুলোর ছোঁয়ায়। যদিও প্রধান অর্থনীতিগুলো চেষ্টা করছে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য কাঠামোগত কিছু সংস্কার সাধনে, কিন্তু এখনো এ পরিবর্তনের গতি অনেক কম; আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে। সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতে যেসব বিষয় কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে, তা ঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না।

এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে চীন হার্ড ল্যান্ডিং এড়ানোর জন্য কাজ করবে। তবে এজন্য যে পরিমাণ কাজ করা দরকার, তা করতে পারবে না। ফলে লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। চীনে আর্থিক দুর্বলতাকে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে, কিন্তু দুর্দশার সময় এগুলো এড়ানো যাবে না। এ পরিস্থিতি ইউরো জোনের সদস্য দেশগুলোর আরো বেশি একাত্ম হওয়ার পথে নামমাত্র অগ্রগতি ঘটাবে। জার্মানির ক্রমাগতভাবে সত্যিকার অর্থে ঝুঁকি বণ্টন বা আর্থিক ঐক্য এড়িয়ে যাওয়া ঠেলায় পড়া সদস্য দেশগুলোর কঠোর সংস্কার পদক্ষেপ নেয়ার উদ্যোগকে দুর্বল করে দেবে। জাপানে আরো অকার্যকর হয়ে চলা আবে প্রশাসন কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে। এতে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশের নিচে আটকে থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অস্থির ও অকার্যকর নেতৃত্বে অস্থিতিশীল হয়েই থাকবে। ট্রাম্পের বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও আরো বেশি মার্কিন নাগরিক বুঝতে পারবেন, ট্রাম্প নিছক একজন ধনদর্পী, যিনি শুধু ধনীদের স্বার্থই রক্ষা করেন। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রে অসমতা বৃদ্ধি পাবে, মধ্যবিত্তদের অবস্থান থমকে দাঁড়াবে, মজুরি নামমাত্র বাড়বে এবং ভোগ ও প্রবৃদ্ধির রক্তশূন্যতায় ভোগা অব্যাহত থাকবে, যা থাকবে নামমাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি।

অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের মধ্যম মানের কারণে বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি আরো বাড়ছে। এ পরিস্থিতি ভারসাম্যের স্থিতিশীলতার অবস্থা তুলে ধরছে না, বরং প্রতিফলিত করছে অস্থির ভারসাম্যহীনতাকে। এ পরিস্থিতি অর্থনৈতিক, আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক ধাক্কার কাছে ঠুনকো। যখন এ ধরনের ধাক্কা আসতে শুরু করবে, তখন বিশ্ব অর্থনীতি শ্লথগতির চক্রে পড়ে যাবে। অথবা এ ধাক্কা যদি যথেষ্ট বড় হয়, তাহলে আসবে মন্দা ও অর্থনৈতিক সংকট।

অন্যভাবে বলতে গেলে, যদি বিশ্ব সঠিক কাজটি না করে, বিভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ঘোরে, তাহলে পরিস্থিতি ভয়ানক হতে বাধ্য। কিন্তু এখন এটাই দেখা যাচ্ছে, ফলে আগামী তিন বা চার বছরের জন্য নেতিবাচক আউটলুক দেখা যাবে। এখানে শিক্ষাটা পরিষ্কার, হয় রাজনৈতিক নেতা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যমেয়াদি আউটলুক ভালো করতে যে নেতৃত্বের প্রয়োজন, তা করে দেখাতে হবে; নতুবা প্রবৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি নিম্নগতি বাস্তবে পরিণত হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক ক্ষতি হবে।

 

লেখক: অর্থনীতির অধ্যাপক, স্টার্ন স্কুল অব বিজনেস, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি