ব্রিকসের অষ্টম শীর্ষ সম্মেলন: আঞ্চলিক বাণিজ্য গুরুত্ব পাচ্ছে

Print Friendly, PDF & Email

জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গুরুত্ব পাচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্রিকস সম্মেলনে। শনিবার ভারতের গোয়ায় শুরু হয়েছে ব্রিকসের দুই দিনব্যাপী অষ্টম শীর্ষ সম্মেলন। উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোর জোট হিসেবে ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না, সাউথ আফ্রিকা) সম্মেলনকে গুরুত্ব দিচ্ছে এ অঞ্চলের দেশগুলো। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও আঞ্চলিক বাণিজ্য গতিশীল হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হওয়ায় ব্রিকস-বিমসটেক সম্মেলনের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে।

সম্মেলনের প্রথম দিনে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ১৬টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। আজ প্রথম ব্রিকস-বিমসটেক সম্প্রসারিত শীর্ষ সম্মেলনও হবে গোয়ায়। ভারতে এসেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন। শনিবার সকালে বৈঠক শেষে এ দুই শীর্ষ নেতা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।

দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৬টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। স্মার্ট সিটি, মিলিটারি, গ্যাস ও তেল সংক্রান্ত চুক্তি এর মধ্যে অন্যতম। হরিয়ানা স্মার্ট সিটি তৈরি করা নিয়ে কথা বলেছেন দুই নেতা। এছাড়া রাশিয়ার তেল ও গ্যাস সেক্টরে ভারত প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে বলে চুক্তি হয়েছে। অর্থনৈতিক সংযুক্তির লক্ষ্যে এসব চুক্তিকে দুটি দেশের মধ্যে অংশীদারিত্ব জোরদার করার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা- এ পাঁচ দেশের আদ্যাক্ষর নিয়ে ব্রিকস নামকরণ। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ২০০৯ সালে গঠন করা হয় এটি। ২০১০ সালে যুক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর থেকে এটি ব্রিকস নামে পরিচিত। ব্রিকসের পাঁচটি রাষ্ট্রই জি-২০ এর সদস্য। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর জিডিপি বিশ্বের মোট জিডিপির ১৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং এ পাঁচটি দেশের জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪২ ভাগ।

সম্মেলনে যোগ দিতে বিমসটেক সদস্যভুক্ত দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে আয়োজক দেশ ভারত। বিমসটেক সদস্যভুক্ত নয়, এমন দুই দেশ আফগানিস্তান ও মালদ্বীপকেও সম্মেলনে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ব্রিকসের সপ্তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় রাশিয়ার উফা শহরে। বর্তমানে ব্রিকসের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছে ভারত।
ভারত-রাশিয়া ১৬ চুক্তি সই

ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে ভারতে এসেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন। শনিবার সকালে বৈঠক শেষে এ দুই শীর্ষ নেতা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৬টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

স্মার্ট সিটি, মিলিটারি, গ্যাস ও তেল সংক্রান্ত চুক্তি এর মধ্যে অন্যতম। হরিয়ানা স্মার্ট সিটি তৈরি করা নিয়ে কথা বলেছেন দুই নেতা। এছাড়া রাশিয়ার তেল ও গ্যাস সেক্টরে ভারত প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে বলে চুক্তি হয়েছে। অর্থনৈতিক সংযুক্তির লক্ষ্যে এসব চুক্তিকে দুটি দেশের মধ্যে অংশীদারিত্ব জোরদার করার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দুই নেতার বৈঠকে সন্ত্রাস দমন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা, পরমাণু বিদ্যুৎ, পরিকাঠামোসহ একাধিক বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে কথা হয়েছে। এ বৈঠকের পরই দু’দেশের মধ্যে কয়েকশ’ কোটি টাকা মূল্যের একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অন্যতম পছন্দের সমরাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী হল পুতিনের দেশ। শনিবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ­লাদিমির পুতিন ও প্রধানমন্ত্রী মোদির সামনে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা) মূল্যের ‘এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ’ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ভূমি থেকে আকাশ (স্যাম) মিসাইল সিস্টেম চুক্তি স্বাক্ষর করে দুই দেশ। এর সঙ্গে থাকবে প্রায় হাজার মিসাইল।

ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ সিস্টেমগুলো চীন ও পাকিস্তান সীমান্তে মোতায়েন করা হবে। প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে আরও একাধিক চুক্তি হয়েছে এদিন। ঘোষণা অনুযায়ী, ভারতীয় নৌসেনার জন্য চারটি অত্যাধুনিক স্টেলথ ফ্রিগেট যুদ্ধজাহাজ তৈরি করবে রাশিয়া। এদিন দুই নেতা কুনদাকুলাম বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩ ও ৪নং ইউনিটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

কর্মকর্তারা জানান, বেশকিছু এমওইউ স্বাক্ষরের মাধ্যমে এগিয়ে গেল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। এস-৪০০ মিসাইল চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পাশাপাশি আরও বেশকিছু ক্ষেত্রে দু’দেশের মধ্যে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঘোষণা করা হয়েছে যৌথ উদ্যোগের কথাও।

চুক্তি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, আর্থিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গাঢ় হবে। এ চুক্তির ফলে দুটি বার্ষিক সম্মেলনের পর থেকে নতুন পথে এগিয়ে গেল ভারত-রাশিয়ার সম্পর্ক।

উল্লেখযোগ্য যে যে চুক্তি স্বাক্ষর হল ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে- অন্ধ্রপ্রদেশে স্মার্ট সিটি পরিবহনের পরিকাঠামো ব্যবস্থা উন্নয়নে এমওইউ, অন্ধ্রপ্রদেশে যৌথভাবে জাহাজ তৈরির পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বোর্ড, হরিয়ানা স্মার্ট সিটি প্রজেক্ট, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে যৌথ উদ্যোগ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতা চুক্তি, পরিকাঠামো তহবিল, ভারতীয় ও রুশ রেলের মধ্যে চুক্তি, ২২৬টি কামোভ হেলিকপ্টারের জন্য এমওইউ, মহাকাশ নিয়ে রুশ স্পেস কর্পোরেশন ও ইসরোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, রসনেক্ট, এসার ও ওএনজিসির মধ্যে চুক্তি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা নিয়ে এমওইউ, আন্তর্জাতিক তথ্য সুরক্ষা নিয়ে যৌথ উদ্যোগ।
সার্কের বিপরীত মঞ্চ ব্রিকস

ব্রিকস ব্যবহার হচ্ছে সার্কের বিপরীত মঞ্চ হিসেবে। সম্মেলন ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিশেষ মঞ্চের সম্মেলনে মোদি দেখা করেছেন পুতিন এবং শি জিনপিং উভয়ের সঙ্গেই। ভারত সরকার এ মঞ্চটিকেই কৌশলে সার্কের বিকল্প হিসেবে প্রজেন্ট করবে, যাতে পাকিস্তান সম্পূর্ণ একঘরে ও কোণঠাসা হয়। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের কারণে স্থগিত হয়ে গেছে সার্ক সম্মেলন।

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোট সার্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন আরেকটি আঞ্চলিক জোট ব্রিকস কি তার জায়গা নিতে চাচ্ছে? এ প্রশ্ন উঠেছে ব্রিকস আঞ্চলিক জোটকে চাঙ্গা করার এক নতুন উদ্যোগকে ঘিরে।

সম্প্রতি ইসলামাবাদে সার্ক সম্মেলন বয়কটের মধ্যে দিয়ে ওই জোটের ভবিষ্যৎ যখন প্রশ্নবিদ্ধ, তখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত প্লাটফর্ম বিমসটেককে ঘিরে কিন্তু সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। নেপাল-ভুটান ছাড়া বাকি পাঁচটি দেশ মিলে ১৯ বছর আগে যখন বিমসটেকের সূচনা করেছিল, তারপর থেকে এ জোট এতটা গুরুত্ব আগে কখনও পায়নি।