প্রেমে সাম্যে আর বিদ্রোহে একাকার নজরুল

Print Friendly, PDF & Email

এক অস্থির সময়ে বাঙ্গালির প্রচণ্ড ক্ষোভের নাম নজরুল, প্রেমের সঙ্গে বিদ্রোহ আর সাম্যের মেলবন্ধণ হয়ে উঠেছে যার সৃষ্টির এক অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য।

নজরুলের জন্ম দারিদ্রের মধ্যে। শিশুকাল থেকেই তাকে ঘিরে ছিল দারিদ্রের অভিশাপ। নিজেই জোগাড় করেছেন নিজের ক্ষুধার অন্ন। হয়তো এ কারণেই তার গানে, কবিতায় শোভা পেত সাম্যের কথা, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন এক সমাজের কথা। তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর। আর সে কণ্ঠের অমর বাণী-

গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

ধর্মীয় সংকীর্ণতা আর গোঁড়ামির ঊর্ধ্বের মানুষ ছিলেন নজরুল। ইসলাম নিয়ে যেমন প্রচুর লিখেছেন, তেমনি শ্যামা সঙ্গীতও রচনা করেছেন অনেক। জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন নিজের চার সন্তানের নামে। কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। এ যেন সন্তানের নামের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের মানুষের সব বিভেদ ভুলে একাকার হয়ে ওঠার সামান্য হলেও বাস্তবায়ন।

এক ভাষণে নজরুল বলেছিলেন- ‘কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, ও দুটোর কোনোটাই নয়। আমি শুধু হিন্দু মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করছি।’

নজরুল ছিলেন স্বাধীনচেতা। আজন্ম বিদ্রোহ যার রক্তে, তার কি ভালো লাগে বৃটিশরাজের ছড়ি ঘোরানো? তিনি লিখলেন-

বল বীর

বল উন্নত মম শির।

শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!

দীর্ঘদিন ঘুমিয়ে থাকা জাতির জীবনে বারুদের আগুন হয়ে দেখা দিল কবিতাটি। ১৯২২ সালে ‘বিজলী’ ও পরে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় কবিতাটি প্রকাশের পর বিদ্রোহী কবি উপাধি পেলেন নজরুল।

এর কিছুদিন পর ‘ধুমকেতু’ নামে পত্রিকা বের করলেন নজরুল। সেখানে তার কলম থেকে অগ্নি ঝরত, আর তার বিক্ষোভের তপ্ত ঝাঁঝ গিয়ে লাগত বৃটিশ সাম্রাজ্যের গায়ে। তিনি রচনা করলেন ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘আনন্দময়ীর আগমনে’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘ধুমকেতুর’ মত অসংখ্য রক্তগরম কবিতা।

নজরুল মনেপ্রাণে বিদ্রোহী ছিলেন। তার ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ছিল ইংরেজ রাজশক্তির গালে চপেটাঘাত। তার কবিতায় যে তীব্র প্রতিবাদের জোয়ার উঠেছিল, তা থামাতে ইংরেজ সরকার তাকে জেলে পুরেছিল। নজরুলের আগেও বেশ কিছু বাঙ্গালি কবির ভাগ্যে রাজরোষ জুটেছিল, তবে তার মত এত তীব্রভাবে কাউকে আক্রমণ করা হয়নি। তার ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশের কিছুদিন পরেই বাজেয়াপ্ত করা হয়। ‘আনন্দময়ীর আগমনের’ কপালেও জুটল নিষেধাজ্ঞা।

নজরুলের মনোবাসনায় স্বাধীনতার আকাঙ্খা কতটা জোরালো হয়ে উঠেছিল তা বোঝার জন্য একটি ঘটনা যথেষ্ট। একদিন এয়ারগান পেয়ে বন্ধু শৈলজাকে  নিয়ে পাখি মারতে গেলেন নজরুল। এক পর্যায়ে পাখি বাদ দিয়ে তিনি এয়ারগান তাক করলেন একটি সিমেন্টের বেদির দিকে। আক্রোশে বেদির দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলেন। বন্ধু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এসব কী হচ্ছে? তখন তিনি বললেন, ইংরেজগুলোকে খতম করছি।

১৯২৩ সালে কবিকে গ্রেফতার করা হয় কুমিল্লা থেকে। তার পক্ষ সমর্থনে বিনা পারিশ্রমিকেই বেশকিছু আইনজীবী এগিয়ে এসেছিলেন। এ সময় আদালতে তিনি যে জবানবন্দী দেন, তা বাংলা সাহিত্যে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে অমর হয়ে আছে। বিচারের পর কবিকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

জেলখানায় কারাবন্দীদের সঙ্গে নির্যাতনমূলক আচরণ, বৈষম্য ও রাজবন্দীর প্রাপ্য মর্যাদা না দেয়ায় প্রতিবাদে তিনি অনশন শুরু করেন। সারা ভারতবর্ষে তুমুল আলোড়ন তুলল ঘটনাটি। বাংলার সাহিত্যিকসমাজ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনশন ভাঙ্গার জন্য নজরুলকে অনুরোধ করতে এসেছিলেন জেলগেটে, তবে দেখা করতে পারেননি।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনশন ভাঙ্গার অনুরোধ করে তার বার্তা পাঠান, বিচিত্র কোনো কারণে তা নজরুলকে জানানো হয়নি। এ সময় রবিঠাকুর তার ‘বসন্ত’ গ্রন্থখানি নজরুলকে উত্সর্গ করে বলেন, ‘জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল তাই আমার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থখানি ওকেই উতসর্গ করছি’। এ সময় রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে কবিতা লেখা কোনো ভাবেই বন্ধ না করার অনুরোধ করে বলেন, ‘সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা জাগাবার কবিও তো চাই’।

অস্বস্তিতে পড়ে ব্রিটিশরা রণে ভঙ্গ দিয়ে দাবি মানার আশ্বাস দিলে ও মাতৃস্থানীয় বিরজাসুন্দরীর অনুরোধে ৩৯ দিন পর কবি অনশন ভাঙ্গেন।

আজন্ম বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা নজরুলের চেতনা ও সাহিত্যকর্ম আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা হয়েছিল-

কারার ওই লৌহ কপাট

ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট

রক্ত জমাট, শীতল পুজোর

পাষাণ বেদি…

নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি ছিলেন না, তার কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে প্রেমের রূপ। কবির গান ও কবিতায় বিদ্রোহ ও প্রেমের দ্বৈত চিত্রকল্প একইসঙ্গে মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিদ্রোহের অনলে পুড়লেও শাশ্বত প্রেমের আহ্বানকেও কবি না বলেননি। তিনি যেমন রণতরীতে যাত্রা করেছেন, তেমনি প্রেমের সাগরেও ভেলা ভাসিয়েছেন। তার গান, কবিতা, গজলে দ্বৈত চেতনায় স্ফুরিত হয়েছে। বিদ্রোহী প্রেমিক কথাটি তাই সম্ভবত নজরুলের ক্ষেত্রেই শতভাগ সত্য।

তার কবিতা ও গানে আমরা একইসঙ্গে পাই প্রেমিক ও বিদ্রোহী সত্তাকে। বিদ্রোহের চরম সীমায় পৌঁছে কবি যখন ঝঙ্কার তোলেন-

মহা প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস

আমি ভেঙ্গে করি সব চুরমার।

তখন ধ্বংসলীলায় মেতে উঠতে আমরাও দ্বিধা করিনা। আবার নজরুল তার গানে যখন উদাত্ত আহ্বান জানান-

মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী

দেব খোঁপায় তারার ফুল

তখন কবি নিতান্তই প্রেমিক হিসেবে ধরা দেন। এখানে তিনি প্রেমিকাকে প্রকৃতি থেকে উপকরণ নিয়ে সাজাতে চান, হূদয়ের রাণীর ভালোবাসার স্রোতে ভেসে যেতে চান।

একইসঙ্গে বিদ্রোহ ও প্রেমকে ধারণ করে এমন স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ কেবল নজরুলের পক্ষেই সম্ভব। তার গান, কবিতা, বক্তৃতায় যে আগুন ঝরেছে তা আর কোনো কবির বেলায় হয়নি। সাম্রাজ্যবাদের ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে তিনি বলতে পারেন—

তোদের চক্ষু যতই রক্ত হবে

মোদের চক্ষু ততই ফুটবে।

নজরুলের সুপ্রসিদ্ধ গান—

দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার

লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিতে যাত্রিরা হুঁশিয়ার …….

ইহাদের পথে নিতে হবে সাথে দিতে হবে অধিকার।

আবার মধ্যরাতে যখন সমস্ত কলরব থেমে যেত, প্রকৃতি হয়ে যেত নিস্তব্ধ তখন কবি মনের গহীনে ডুবে যেতেন। কোনো এক স্তব্ধ রাতে তিনি কবিতায় লিখেছিলেন—

থেমে গেছে রজনীর গীত কোলাহল

ওরে মোর সাথী আঁখি জল

এইবার তুই নেমে আয় অতন্দ্র এই নয়ন পাতায়।