বেআইনিভাবে ২০ মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ

Print Friendly, PDF & Email

বেআইনিভাবে পদে রয়েছেন ২০ মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। আইন অনুযায়ী, শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদনসাপেক্ষে মার্চেন্ট ব্যাংকের এমডি কিংবা সিইও নিয়োগের বিধান রয়েছে। কিন্তু তা পরিপালন করছে না এসব মার্চেন্ট ব্যাংক।

দেশে এখন পর্যন্ত ৫৫টি প্রতিষ্ঠানকে মার্চেন্ট ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স দিয়েছে বিএসইসি। এর মধ্যে কেবল চারটি প্রতিষ্ঠান শুধু পোর্টফোলিও ম্যানেজার বা আন্ডার রাইটার কিংবা ইস্যু ম্যানেজারের কাজ করার নিবন্ধন পেলেও বাকি ৫১টিই পূর্ণাঙ্গ মার্চেন্ট ব্যাংক।

মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর এমডি অথবা সিইও নিয়োগ, বরখাস্ত, ক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে ২০১১ সালের ২০ ডিসেম্বর সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার) বিধিমালা, ১৯৯৬-এর কয়েকটি বিধি সংশোধন করে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বিএসইসি। ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মার্চেন্ট ব্যাংকের এমডি অথবা সিইও নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশনের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়।

একই সঙ্গে মার্চেন্ট ব্যাংকের এমডি অথবা সিইও কোনো মার্চেন্ট ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার বা উদ্যোক্তা কিংবা পরিচালক হিসেবে থাকতে পারবেন না। আবার মার্চেন্ট ব্যাংকের এমডি বা সিইও পদটি তিন মাসের বেশি সময় খালি রাখা যাবে না। এছাড়া এ পদে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তিন মাসের বেশি থাকতে পারবেন না।

তবে ২০টি মার্চেন্ট ব্যাংক এ আইন লঙ্ঘন করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ব্যাংকের পরিচালক অথবা শেয়ারহোল্ডার কমিশনের অনুমোদন না নিয়েই সংশ্লিষ্ট পদে রয়েছেন। বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে এমডি অথবা সিইও পদ পূরণ করা হয়েছে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে।

ভারপ্রাপ্তদের সাময়িকভাবে (সর্বোচ্চ ৯০ দিন) এ পদে থাকার বিধান থাকলেও কেউ কেউ রয়েছেন বছরব্যাপী। আবার বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে এমডি পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। শীর্ষ পদে আইন লঙ্ঘনকারী এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের মালিকানাই ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান  বলেন, যারা আইন পরিপালন করেনি, আমরা তাদের চিঠি দিয়ে প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এমডি অথবা সিইও পদ পূরণের নির্দেশনা দিয়েছি। এর পরও যদি কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়, তাহলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জানা গেছে, শীর্ষ পদে উচ্চবেতনের কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠানে এমডি পদটি শূন্য রয়েছে। মার্চেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রত্যাশিত আয় না আসায় উচ্চবেতনে শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগে অনাগ্রহ রয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানের। মার্জিন ঋণ সংকট, নিজস্ব পোর্টফোলিওতে লোকসান ও ইস্যু ব্যবস্থাপনা করতে না পারায় অনেক মার্চেন্ট ব্যাংকই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে ব্যর্থ হচ্ছে। এ কারণে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে কাজ চালাচ্ছে।

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে সাময়িকভাবে এমডি পদ চালাতে হলেও বিএসইসির অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানই এ অনুমোদন নেয়নি। আইন অনুযায়ী, এমডি পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ওই পদে নিয়োগ দিতে পরিচালনা পর্ষদ যদি ব্যর্থ হয়, তবে কমিশন প্রয়োজনবোধে নির্ধারিত সময়ের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে এ পদে নিয়োগ দিতে পারবে। সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির বেতন-ভাতাদি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বহন করতে হবে।

দেশে শুরুর দিককার মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এএএ ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান খাজা আরিফ আহমেদ বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি মার্চেন্ট ব্যাংকটির পরিচালক পদেও রয়েছেন, যা মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার বিধিমালার লঙ্ঘন। বিএসইসির অনুমোদন ছাড়াই এ পদে রয়েছেন খাজা আরিফ আহমেদ।

একইভাবে পদে রয়েছেন ইসি সিকিউরিটিজ লিমিটেডের সিইও তানজিল চৌধুরী। ব্যবসায়ী আজম জে. চৌধুরীর মালিকানাধীন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইসি সিকিউরিটিজ ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্চেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। তানজিল চৌধুরী আজম জে. চৌধুরীর ছেলে, যিনি ইস্ট কোস্ট গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদেও রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি মূলত নিজেদের পোর্টফোলিও পরিচালনা করে। এছাড়া আইপিওতে আন্ডার রাইটার ও করপোরেট ফিন্যান্সের কাজ করে।

স্বদেশ ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের মালিকানায় রয়েছেন মামুন আহমেদ। একই সঙ্গে এমডি পদটিও ধারণ করছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে মামুন আহমেদ বলেন, ‘ক্যাপিটাল মার্কেটে আমার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতাও রয়েছে। আমার প্রতিষ্ঠানে আমার চেয়ে ভালো কোনো দক্ষ কিংবা যোগ্য ব্যক্তি তো আমি পাব না। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি আমার নিজের হওয়ায় আমি কখনই চাইব না, এর কোনো ক্ষতি হোক। তাই আমি মনে করি, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া প্রয়োজন।’

এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটাল পার্টনারস ইনভেস্টমেন্টস ও ইউনিক্যাপ ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের এমডি পদটি দীর্ঘদিন ধরে চালানো হচ্ছে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে। এমডি পদে শূন্যতার কারণে ইউনিক্যাপ ফিন্যান্সে এ পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কোম্পানি সেক্রেটারি। এ বিষয়ে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি এ পদে একজনকে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শিগগিরই নিয়োগের অনুমোদন চেয়ে কমিশনে আবেদন করা হবে।

এমডি পদে নিয়োগের বিষয়টি বিএসইসির অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন বলে জানান সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেস লিমিটেডের এমডি ও সিইও এরশাদ হোসেইন। তিনি বলেন, ‘এজন্য এজিএম আহ্বান করা হচ্ছে। শিগগিরই বিএসইসির অনুমোদনের জন্য আমরা আবেদন জানাব।’

দীর্ঘদিন ধরে এমডি কিংবা সিইও পদটি খালি রয়েছে কসমোপলিটন ফিন্যান্স লিমিটেডসহ কয়েকটি মার্চেন্ট ব্যাংকে। এর বাইরে বেশ কয়েকটি মার্চেন্ট ব্যাংকে এমডি পদে নিয়োগ দেয়া হলেও কমিশনের অনুমোদন নেয়া হয়নি। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এমডির মেয়াদ তিন বছর পার হলেও বিএসইসি পুনরনুমোদন নেয়া হয়নি।

এমডি অথবা সিইও পদ পূরণে আইন লঙ্ঘনকারী এসব মার্চেন্ট ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে—উত্তরা ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বিএলআই ক্যাপিটাল, সোনার বাংলা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট, রেস পোর্টফোলিও অ্যান্ড ইস্যু ম্যানেজমেন্ট, এনবিএল ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইকুইয়টি ম্যানেজমেন্ট, আইআইডিএফসি ক্যাপিটাল, রুটস ইনভেস্টমেন্ট, জিএসপি ইনভেস্টমেন্টস, সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটাল, সিএপিএম অ্যাডভাইজরি, সিটিজেন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, আইএল ক্যাপিটাল ও এসবিএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা