সবলের পদতলে পিষ্ট দুর্বলঃ

Print Friendly, PDF & Email

সোহাগী জাহান তনু, সাম্প্রতিক সময়ে বহুলালোচিত একটি নাম । গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাস সংলগ্ন সংরক্ষিত এলাকা থেকে যার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে । গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম থেকে জানা যায়, তনুর হত্যাকারী/হত্যাকারীরা ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বা ধর্ষণ পরবর্তী সময়ে তাকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে।

লাশ ময়নাতদন্ত হয়েছে, তনুর বাবা থানায় অজ্ঞাত ব্যাক্তিদের আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, কেও গ্রেপ্তার হয়নি, ঘটনার রহস্য এখনো পুলিশী তদন্তাধীন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ জানিয়ে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে সর্বসাধারণ বিক্ষিপ্তভাবে বিক্ষোভ করছে ।

এই হচ্ছে সোহাগী জাহান তনুর নাম বহুলালোচিত হবার সংক্ষিপ্ত কারণ । কিন্তু তনু হত্যার বিষয়টি যদি আমরা গতানুগতিকতার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সময়ের প্রয়োজনে একটু ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে কি এরকম পৈশাচিক ঘটনা আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হবে?

7392_f4

আমরা কি প্রতিনিয়ত এরকম ঘটনা দেখছি না? আমরা কি সময়ে সময়ে ক্ষেত্রবিশেষে পরাক্রমশালী হয়ে নিজেরাই এরকম ঘটনার জন্ম দিচ্ছি না? তনুকে যে/যারা নির্যাতন করে হত্যা করেছে সে/তারা শক্তিমত্তার বিচারে নিঃসন্দেহে তনুর চেয়ে শক্তিশালী ।

কেননা, সমান সমানকে নাশ করতে পারে না, বরং শক্তিশালী কর্তৃক দুর্বল বা ক্ষমতাবান কর্তৃক ক্ষমতাহীন নিঃশেষিত হয় । তনু এখানে ক্ষমতাহীনতার/দুর্বলতার প্রতীক । কেননা, আমাদের “মহাপরাক্রমশালী” পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদেরকে ক্ষমতাহীন/দুর্বল হিসাবেই উপস্থাপন করা হয় ।

জন্মলগ্ন থেকেই পরিবার থেকে নারী-পুরুষের মাঝে শক্তিমত্তার যে বিবেদ তৈরি করে দেয়া হয় তা পরবর্তী সময়ে সমাজের প্রতিটা স্তরেই পরিলক্ষিত হয় ।

তাছাড়া শারীরিক দিক বিবেচনায় শক্তির বিচারে স্বাভাবিকভাবেই নারীরা পুরুষদের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে । তনুর পরিচয় সে একজন মানুষ এবং লৈঙ্গিক বিবেচনায় সে নারী, নির্যাতনের ক্ষেত্রে তনুর বেলায় মানুষ পরিচয়ের চেয়ে নারী পরিচয়টাই প্রাধান্য পেয়েছে ।

সে এখানে ক্ষমতাবানের বা সবলের নৃশংসতায় পিষ্ট হয়েছে । সেদিক থেকে এরকম অনেক তনু আছে সাড়া দেশজুড়ে যারা প্রতিনিয়ত সবল পুরুষ কর্তৃক (সে বাবা-ভাই-স্বামী-সন্তান যেইহোক না কেন) শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে ঘরে-বাইরে, কখনোবা তনুর মতই নির্মম পরিণতির শিকার হতে হচ্ছে ।

এটাতো নারী-পুরুষ বিবেচনায় সমাজের সবল-দুর্বলের একটা দিক । সমাজের অন্যান্য দিকেও কি এরকম সবলের পদতলে দুর্বলের পিষ্ট হবার নজির দিন দিন বাড়ছে না? সাম্প্রতিক সময়ে সকলের কাছেই একটি উদ্বেগজনক চিন্তার বিষয় হচ্ছে- আমদের সমাজে নৃশংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষ ক্রমান্বয়ে মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে পশুত্বকে ধারণ করে মানুষরূপী হিংস্র জানোয়ারে পরিনত হচ্ছে ।

সারাদেশে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, গণপিটুনি, ক্রসফায়ার, গুম, খুন, দল-মত নির্বিশেষে ভিন্ন মতাবলম্বীদের উপর নির্যাতনসহ নানাবিদ হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক দৃশ্য তেমনটাই সাক্ষ্য দেয়।

পরিবার,রাষ্ট্র,সমাজ,রাজনৈতিক দল,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল ক্ষেত্রেই প্রবল পরাক্রমশালী ক্ষমতাধর কর্তৃক তুলনামূলক ক্ষমতাহীনদের প্রতি একধরণের অমানবিক, নির্মম কর্তৃত্বারোপ করার মাধ্যমে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে তা হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে ।

ঘটমান ঘটনাগুলোর মাঝে বহুমাত্রিক ভিন্নতা থাকলেও প্রতিটা বর্বরোচিত ঘটনার ক্ষেত্রে একটি দিক থেকে সকলের মাঝে সামঞ্জস্যতা আছে । প্রত্যেকটি ঘটনার ক্ষেত্রেই লক্ষণীয় একটি সাধারণ দিক হচ্ছে- তাঁরাই নৃশংসতার স্বীকার হচ্ছে যারা ক্ষমতা বা শক্তির বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল ।

নারী নির্যাতিত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী পুরুষ কর্তৃক, শক্তিতে পিছিয়ে থাকা শিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে বড়দের দ্বারা, নিরস্ত্রদারীরা নিষ্পেষিত হচ্ছে অস্ত্রদারীদের হাতে, ক্ষমতাহীনরা গুম-খুনসহ নানবিদ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ক্ষমতাবানদের দ্বারা ।

আর এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ সকল প্রকার গণমাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠছে, প্রতিবাদমুখর হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ । কিন্তু তারপরও এসব সহিংসতা কমার পরিবর্তে দিন দিন বাড়ছে, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো ধারাবাহিকভাবে ক্রমবর্ধমান নৃশংসতার মাত্রা ও সংখ্যা বৃদ্ধির তালিকা প্রকাশ করে উদ্বেগ জানাচ্ছে ।

অনেকেই মনে করেন এসব ঘটনার ক্ষেত্রে সুশাসনের অভাব ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার বিলম্বের কারণেই জ্যামিতিক হারে সমাজে বিস্তার লাভ করছে এধরনের নৃশংসতা । এগুলোও একটা দিক, কেননা সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজে অন্যায়ের বিরদ্ধে একধরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়, সেক্ষেত্রে সুশাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় গড়িমসি হলে তা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় না, মানুষের মাঝে অন্যায় বিরোধী কোনো মনোভাব গড়ে উঠে না ।

কিন্তু সুশাসনের অভাব ও বিলম্বিত বিচারিক প্রক্রিয়াই সমাজে নৃশংসতা বৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয় । আমাদের সমাজতাত্ত্বিকদের উচিত বর্তমান সমাজব্যাবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ ও তার অবক্ষয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তর আলোচনার মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করে একটি উন্নততর মানবিক সমাজব্যাবস্থা বিনির্মাণের দিক-নির্দেশনা দেয়া ।

নতুবা, আমরা কেও সমাজের বাইরে নয়, সমাজে যে নৃশংসতার বিষবাষ্প প্রবাহিত হচ্ছে তা একদিন আমাদের স্বাভাবিক জীবনকেও বিপর্যস্ত করে তুলবে । ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের একটি অন্যতম দিক হচ্ছে অপব্যাবহার হবার সম্ভাবনা, কেননা যেখানে ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব আছে সেখানে তার অপব্যাবহার হবার সম্ভাবনাও আছে ।

সেক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকা অপরিহার্য, ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের অধিকারীদের বোধ-বিবেক সর্বদা জাগ্রত থাকবে এমন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে সমাজের প্রতিটা স্তরে ।

তাছাড়া সকলের অভীষ্ট লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সামাজিক কাঠামো বিনির্মাণ করা যেখানে দুর্বলরা প্রবল পরাক্রমশালীদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন না করে স্বাভাবিক পরিবেশে মানবিক উৎকর্ষতা সাধন করতে পারে ।

যদি তেমন একটি মানবিক সমাজ আমরা তৈরি করতে পারি তাহলেই তনু-রাজন-রাকিবদের মতো আর কাওকেই অকালে ঝরে পড়তে হবে না । আর যদি আমরা নিজেরাই সংশোধিত, পরিবর্তিত না হয় তাহলে এসব ঘটনার যতই নিন্দা করি না কেন, যতই প্রতিবাদমুখর হইনা কেন তাতে কোন লাভ হবে না, মানুষের হিংস্রতা প্রতিরোধে কোনো কাজে আসবে না, সমাজে এর কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হবে না ।

একদিকে, রাষ্ট্র বা সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এধরনের  ন্যাক্কারজনক ঘটনায় যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে, যদি সরকার এরকম পদক্ষেপ না নেয় তবে সর্বসাধারণ কর্তৃক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে হবে ।

অন্যদিকে, নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমরা সকলেই যদি আত্মপরিশুদ্ধিতার চর্চা করি তাহলে একদিন পুরো সমাজটাই কলুষমুক্ত হয়ে শুদ্ধতার চাঁদর গায়ে জড়াবে । আজকে যারা বিভিন্ন মাধ্যমে রাজন-রাকিব-তনুসহ অন্যান্য অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের প্রতি যে নৃশংসতার ঘটনাগুলোর নিন্দা করছেন, প্রতিবাদমুখর হচ্ছেন নিঃসন্দেহে তারা সমাজ কর্তৃক সাধুবাদ পাবার যোগ্য ।

একই সাথে আমাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে যেন এধরনের নিন্দা-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে নিজেদের মাঝে অবস্থান করা ও দিন দিন পরাক্রমশালী হয়ে উঠা পশুত্বটাকে বিসর্জন দিতে পারি, পাশাপাশি এটাও  বিবেচনায় রাখতে হবে- আমরা যেন সমাজের  বিভিন্ন প্লাটফর্মে অবস্থানকালীন সময়ে ক্ষমতাবান হলেও তুলনামূলক সীমিত ক্ষমতার অধিকারীদের প্রতি নির্দয় না হয়ে দায়িত্বশীল ও মানবিক থাকতে পারি । সর্বোপরি, আমরা যেন মানুষরূপী না হয়ে প্রকৃতার্থেই মানুষ হয়ে উঠতে পারি ।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।