সফল হতে চলেছে সাগর ও পাহাড় একসাথে দেখার স্বপ্ন

Print Friendly, PDF & Email
পথে যেতে যেতে একসাথে সাগর ও পাহাড় দেখার অনেক দিনের স্বপ্ন অবশেষে সফল হতে চলেছে। শুধু তাই নয়, দিগন্ত বিস্তৃত সুনীল সমুদ্রের সফেন ঊর্মিমালার ছন্দে শিহরিত হিরন্ময় পাহাড়, মুগ্ধ সবুজ বন বিথীকায় অনন্য সুষমা মন্ডিত কক্সবাজার শহর থেকে সৈকতের তীর ঘেঁষে সুদূর টেকনাফ পর্যন্ত যাত্রায় প্রথম দেখা মিলবে স্বপ্নের ‘খোয়াব’ শহরের। তারপর দৃষ্টি চলে যাবে সুউচ্চ হিমছড়ি পাহাড় বেয়ে হিম শীতল পানির অবিরাম ঝর্ণা ধারায়।
মনোরম ও মনোলোভা মহিমান্বিত ইনানী সৈকতে অসংখ্য প্রবাল পাথরের সমারোহে সমুদ্রের অবারিত নীল জলরাশি থেকে আঁচড়েপড়া মৃদু থেকে উথাল পাতাল ঢেউ তো শিহরণ তোলবেই। পৃথিবীর বারান্দা খ্যাত এবং কাদামুক্ত মসৃণ সমতল বালিয়াড়িতে অসংখ্য লাল কাঁকড়া যেন লাল কার্পেট বিছিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাবে। এই দৃশ্য দেখতে দেখতেই পেয়ে যাবেন পাটুয়ারটেকে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত কিংবদন্তী ‘কানা রাজার গুহা’। তারপর হোয়াইক্ষ্যং এর ‘কুদুম গুহার’ অচেনা পাখির কিচিরমিচির ডাক না শুনে যাবেন কোথায় ?
পরীর দেশ দেখবেন ? হ্যাঁ। কিংবদন্তী রয়েছে যে, এক সময় টেকনাফের মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে পরীরা বাস করতো বলে প্রথমে এর নামকরণ করা হয় পরীর দ্বীপ। পরবর্তীতে এর নাম হয় শাহপরীর দ্বীপ। এসব দেখতে দেখতে নিজকে হারিয়ে ফেলবেন অন্য রকম এক স্বপ্নময় ভূবনে।
তারপর ? পর্যটকদের কাছে স্বপ্নপুরী চর্তুদশী জমিদার কন্যা মাথিনের নিখাদ প্রেমের ঐতিহাসিক নিদর্শন ‘মাথিনের কূপ’ দেখতে চান ?। সেই বৃটিশ শাসনামলে টেকনাফে কর্মরত সুদর্শন পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ ভট্টাচার্য থানা প্রাঙ্গনে কূপে পানির জন্য মাথিনের আগমন প্রত্যাগমনের সুবাদে উভয়ে প্রেমবন্ধনে আবদ্ধ হন কিন্তু গোত্র আভিজাত্যের প্রতিবন্ধকতায় ধীরাজ জমিদার কন্যা মাথিনকে বিয়ে করতে ব্যর্থ হন। সুমধুর প্রেমের করুণ বিচ্ছেদে মাথিন তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করেন।
এতে শ্বাশত অকৃত্রিম প্রেমের এক ইতিহাস বিরচিত হয় অতৃপ্ত প্রেমের অবোধ সাক্ষী মাথিন এবং ‘মাথিনের কূপ’। আর তর সইছে না। যেন এখনই ছুটে যাই। হ্যা,ঁ এসব কিছু একই যাত্রায় দেখার সুযোগ মিলছে শিগগির। দেশের সেনা বাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের একদল সদস্যের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল কক্সবাজার টেকনাফ মেরিণ ড্রাইভ সড়কে এই মহিমান্বিত ভ্রমনের সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।
নির্ধারিত সময়ের এক বছর পূর্বেই মেরিণ ড্রাইভ সড়ক পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে বলে আশা করা হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে স্বপ্নের এই মেরিণ ড্রাইভ সড়ক ২০১৭ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।
কক্সবাজারের কলাতলি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরের তীর দিয়ে মেরিণ ড্রাইভ সড়কের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে। সেনাবাহিনীর ১৭ ইঞ্জিনিয়ার কনষ্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ শুরু করে। নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় সড়কটি তৈরির কাজে।
ঠিক সময়ে ব্যয় বরাদ্দ না পাওয়া তো আছেই,উপরন্তু প্রচন্ড ঢেউয়ের সাথে রীতিমত যুদ্ধ করেই সড়কটি তৈরিতে ধীর গতিতে এগিয়ে যান ইসিবি সদস্যরা। পরবর্তীতে কাজের সুবিধার্থে মেরিণ ড্রাইভ সড়ক নির্মাণের কাজটি তিন ভাগে ভাগ করা হয়।
২০০৮ সালের জুনে সড়কটির প্রথম পর্যায়ের কাজ সমাপ্ত হয়। ২০০৮-’০৯ বছরে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজেও নেমে আসে ধীর গতি। কিন্তু বর্তমান সরকারের সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এর একান্ত উদ্যোগে অর্থ ছাড়সহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় পাওয়ায় ২০১৫ সালের অক্টেবরের শেষের দিকে সড়কটির দ্বিতীয় পর্যায় অর্থাৎ ইনানী থেকে শীলখালী পর্যন্ত ৪৮ কিমি কাজ শেষ হয়। বর্তমানে সড়কটি তৃতীয় পর্যায়ের কাজও সমাপ্তির পথে রয়েছে।
মেরিণ ড্রাইভ সড়কের প্রকল্প পরিচালক মেজর মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম জানান,২০১৪ সালের এপ্রিলে ১৬ ইঞ্জিনিয়ার কনষ্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন সড়কটির অসমাপ্ত কাজের দায়িত্বে আসেন। তিনি জানান, ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ মেজর জেনারেল সিদ্দিকুর রহমান সরকারের সার্বক্ষণিক নির্দেশনা এবং সদর দপ্তরের স্পেশাল ওয়ার্ক অরগনাইজেশন এর সার্বিক তত্তাবধানে ব্যাটালিয়ন সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করার ফলে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর পূর্বেই অর্থাৎ ২০১৭ সালের এপ্রিলেই মেরিণ ড্রাইভ সড়কের কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। তিনি আরও জানান,শেষ পর্যায়ের কাজটি হচ্ছে শীলখালী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৩২ কিমি পর্যন্ত।
ইতিমধ্যেই মাটি ভরাটের কাজ প্রায় শেষ এবং একইসাথে দ্রুত গতিতে চলছে ৪২টি কালর্ভাট ও ৩টি ব্রীজ নির্মাণের কাজ। তিনি জানান,মেরিণ ড্রাইভ সড়কের শোভা বর্ধনের লক্ষে সড়কের পাশে ৩ লক্ষ ঝাউ গাছ এবং কৃষ্ণচূড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৫০হাজার ফুলের চারা লাগানোর কাজও করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সড়কটি চালু হলে পর্যটন শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
তবে মেরিণ ড্রাইভ সড়কের পাশে ঝাউগাছ এর পরিবর্তে নারকেল গাছ লাগানোর পক্ষে মত দিয়েছেন স্থানীয় অসংখ্য মানুষ ও পরিবেশবিদরা। কক্সবাজার পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মুহম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, সাধারণ ঝড়েও ঝাউগাছ ভেঙ্গে পড়ে এবং এই গাছ থেকে কিছুই পাওয়া যায় না। এর পরিবর্তে লক্ষ লক্ষ নারকেল গাছ লাগালে উপকূল সুরক্ষা এবং ডাব-নারিকেলের সাথে অনেক লোকের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। উল্লেখ্য, মেরিণ ড্রাইভ সড়কের মোট দৈর্ঘ্য হবে ৮০কি.মি।