হুমকিতে সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য

Print Friendly, PDF & Email

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। উপকূলীয় ও জলাভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দুই দশক আগে বঙ্গোপসাগরের এ দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। তা সত্ত্বেও এখানে প্রতিদিন অবাধে বিচরণ চলছে পর্যটকদের।

নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গড়ে ওঠছে অবকাঠামো। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। আর প্রতিনিয়ত এ দূষণে মারা যাচ্ছে কাছিম ও মাছসহ নানা প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী।

সরেজমিন সেন্ট মার্টিন ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা থেকে পাঁচটি বড় স্টিমারে করে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার যাত্রী সেন্ট মার্টিনে যান। এছাড়া ট্রলার ও স্পিডবোটের মাধ্যমেও সেন্ট মার্টিনে প্রবেশ করছেন পর্যটকরা। পরিবেশ সুরক্ষায় জেটি এলাকায় দু-একটি প্রচারণামূলক বিলবোর্ড থাকলেও নেই কোনো কার্যকর তদারকি।

দ্বীপের চারপাশের সৈকতজুড়ে আবর্জনার স্তূপে মৃত পড়ে আছে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী। এর মধ্যে আছে সংকটাপন্ন কাছিম, কোরাল ও শামুকসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। পর্যটকদের ফেলে দেয়া বিভিন্ন পণ্যের বোতল ও প্লাস্টিকের আবর্জনা সমুদ্রে পড়ে সংকটময় করে তুলেছে এ প্রবালদ্বীপের পরিবেশ।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় ও জলাভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৫ সালে কক্সবাজারের টেকনাফ সমুদ্রসৈকত ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুসারে (গেজেট প্রকাশ ২৯ জুন, ১৯৯৯) সংকটাপন্ন ওই এলাকায় প্রবাল, শৈবাল, শামুক, ঝিনুক, কাছিম সংগ্রহ ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিষিদ্ধ করা হয়েছে মাছ, কচ্ছপ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকারক কাজ— যেমন পাথুরে ও প্রবাল শিলা আহরণ, সরকারি অনুমোদন ব্যতীত সব ধরনের ভৌত নির্মাণকাজ, নির্মাণকাজে পাথুরে ও প্রবাল শিলার ব্যবহার। গেজেটে শৈবাল আহরণ, গাছপালা কর্তন ও আহরণ, সব ধরনের বন্যপ্রাণী শিকার ও হত্যা, প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংস বা অনিষ্টকারী কার্যকলাপ, ভূমি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারে এমন কাজ এবং মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতিকারক যেকোনো কাজ নিষিদ্ধ করা হয়।

এ আদেশ অমান্যকারীকে পরিবেশ আইন অনুযায়ী ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান থাকলেও কার্যকর হচ্ছে না তা।

২০০৮ সালের পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপমতে, সেন্ট মার্টিনসংলগ্ন সাগরে ৬৬ প্রজাতির কোরালের মধ্যে ১৩টি প্রজাতির কোরাল মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা দ্বীপটির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।

তথ্যমতে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও সামুদ্রিক এলাকায় জীববৈচিত্র্য বিশ্বের মধ্যে বিরল। দ্বীপটিতে ১৫৪ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির স্থলজ গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, ৬৮ প্রজাতির প্রবাল (১৯ প্রজাতির জীবাশ্ম, ৩৬ প্রজাতির শক্ত ও ১৩ প্রজাতির নরম প্রবাল), ১৯১ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১০ প্রজাতির কাঁকড়া, ছয় প্রজাতির প্রজাপতি, ২৩৪ প্রজাতির মাছ (৮৯ প্রজাতির মাছ প্রবালসংলগ্ন এলাকার), চার প্রজাতির উভচর ও ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে।

দ্বীপে ৭৭ প্রজাতির স্থানীয় পাখি, ৩৩ প্রজাতির পাখিসহ মোট ১১০ প্রজাতির পাখি ও ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। এছাড়া রয়েছে চুনাপাথর, জীবাশ্মযুক্ত বেলে পাথর, চুনাযুক্ত বেলে পাথর, খোলসযুক্ত চুনা পাথর, বালুচর ও ঝিনুক পাহাড়। অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে স্পঞ্জ, পাথরী কাঁকড়া, সন্ন্যাসী কাঁকড়া, শঙ্খ শামুক, লবস্টার চিংড়ি ও ঝিনুক দেখা যায় এতে। দ্বীপে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ দেখা যায়।

এর মধ্যে অ্যাঞ্জেল, সজারু, রাঙ্গা কৈ, সুই, প্রজাপতি, সারজন, রাস, বাইন, ভোল, লাল, নাক কোরাল, প্যারট ও উড়ুক্কু মাছ উল্লেখযোগ্য। গ্রিন ও অলিভ টার্টল প্রজাতির কাছিম প্রজননের অন্যতম স্থান সেন্ট মার্টিন।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সরদার শফিকুল ইসলাম বলেন, সেন্ট মার্টিনের কাছিমসহ বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের রক্ষায় একটি তহবিল ছিল। বর্তমানে এটি বন্ধ থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না। মন্ত্রণালয় সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় নতুন কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করছে। এটি বাস্তবায়ন হলে সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সূত্রমতে, ২০০৩ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ব্যাপক পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় স্থানীয়দের হাতে নাজেহাল হন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মদ আলমগীরসহ পরিবেশ কর্মকর্তারা। মূলত এ ঘটনার পর থেকে সেন্ট মার্টিনে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজে নেমে আসে শিথিলতা।

এর পর ২০১০ সালে অধিদপ্তরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মুনীর চৌধুরীর নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওইসময় সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন সদস্য ছাড়াও প্রভাবশালীদের বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এর পর আর কোনো ধরনের অভিযান হয়নি।

প্রতি বছর সেন্ট মার্টিনে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক আসেন। একসময় স্থানীয়দের বাড়িঘর কিংবা সরকারি রেস্টহাউস ও বেসরকারিভাবে দু-একটি মোটেল থাকলেও বর্তমানে শতাধিক বড় রিসোর্ট তৈরি হয়েছে এ দ্বীপে। ১৯৭২ সালে এ দ্বীপে প্রায় ১০০ পরিবার বাস করলেও বর্তমানে এর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দেড় হাজার।

৮ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটিতে সাত-আট হাজার মানুষ বাস করলেও পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে বছরের দুই-তৃতীয়াংশ সময় বহিরাগতরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে এখানে বসবাস করে। পরিবেশ দূষণে সেন্ট মার্টিনের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি এগিয়ে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজের সহযোগী অধ্যাপক সাইদুর রহমান বলেন, সেন্ট মার্টিনকে ইসিএ ঘোষণা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

ওখানকার প্রাণীদের সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে বিষদ কোনো গবেষণা না থাকায় দ্বীপটি রক্ষায় সত্যিকারের কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না। শুধু পর্যটকদের বাধা দিয়ে সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি সরকারি সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে প্রবালদ্বীপ রক্ষায় বৃহত্ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো দূষণের মাত্রা পরিমাপ করে সংকটের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে।