চাকরিক্ষেত্রে মানসিক নির্যাতন

Print Friendly, PDF & Email

আমরা সাধারণত জীবিকার তাগিদে চাকরি করি। চাকরি করে অধিকাংশেরই মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হয়। কিন্তু চাকরিতে বেশিরভাগ মানুষই সন্তুষ্ট হতে পারেনা। অনেক কিছুই এখানে প্রভাবক হিসেবে ক্রিয়াধীন। যেমন পারিশ্রমিক, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, কর্তৃপক্ষের আচরণ, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, কাজের চাপ ইত্যাদি। চাকরির অভিজ্ঞতা আমারও আছে। নিজেও দেখেছি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্মীদের কিভাবে মানসিক নির্যাতন করে।

আমার পরিচিত একজন বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন বিভাগে চাকরি করে। যার সুপারভিশনে চাকরি করেন তিনি খুব উচ্চশিক্ষিত- পিএইচডি ডিগ্রিধারী। এই তথ্যটা দেয়া প্রয়োজন এজন্য যে- সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন সবক্ষেত্রে তার আচার আচরণ, বিদ্যা বুদ্ধিতে হবেন অনুসরণীয়।

অফিসের শুরুতেই তিনি তার অধীনস্তকে ডেকে নিবেন আর সারাদিনে তো বহুবার। দিনের শুরুতেই সূচনা হয় মানসিক নির্যাতনের। তার প্রতিটি কাজে সে ভুল ধরে বিব্রত রাখাও তার যেন কাজের অংশ। হয়তো ঐ ডিগ্রিধারীর নির্দেশনাতেই সে কাজটি সম্পন্ন করেছে। কিন্তু সে তা বেমালুম অস্বীকার করবে। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলেও বলবে- অনেকদিন হলো চাকরি করছেন। আবার মনে কষ্ট চেপে নিজ বুদ্ধিতে কাজ করলেও সমস্যা। বেচারা নাকি বস হয়ে গিয়েছে। উভয় সংকট।

আমার জানামতে, তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই। তবে বোঝা যায় সুপারভাইসর তাকে অপছন্দ করেন। কিন্তু চাকরি ক্ষেত্রে কাউকে ভালো না লাগার কারণে কর্মীকে হয়রানি করা অন্যায়। উক্ত সুপারভাইসর যা করছে তাকে অহেতুক হয়রানি ছাড়া আর কিছুই বলা যায়না। খুবই লঘু, ভদ্রোচিত একটি উদাহরণের মাধ্যমে চাকরি ক্ষেত্রে মানসিক নির্যাতন বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলাম।

অনেকক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। সেদিকে আর না গেলাম। গালিগালাজ, আরও অনেক ভয়াবহ বাক্য ব্যয়ের মাধ্যমে কর্মীদের মানসিক নির্যাতন করা হয়। তার মনোবল একেবারে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।

একটি প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন গোত্র-বর্ণ, চরিত্র-সক্ষমতা, বয়স বিভিন্ন মানসিকতার মানুষ একত্রিত হয়ে কাজ করে। চাকরিক্ষেত্রটাই হচ্ছে কাজ করার জন্য। বিনিময়ে সে পাবে পারিশ্রমিক, আর্থিক নিরাপত্তা। এখানে কেউ কারো প্রভু-মালিক বা বান্দা-ভৃত্য নয়।

কারণ এখানে একজন পরিশ্রমের মাধ্যমে তার বিনিময় নিচ্ছে। কাজ করে সে প্রতিষ্ঠানটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই এগিয়ে নেয়া জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ভূমিকা রাখছে। মালিক-প্রভু বিষয়টা তখনই আসবে যখন কেউ কাউকে মুফতে অর্থ দিচ্ছে। সহজ কথায় বসিয়ে বসিয়ে কাউকে খাওয়াচ্ছে।

আমরা যখন কাউকে দান করি বা ক্রমাগত সাহায্য করি- সেজন্য সে আমার অধীনস্ত বা আমি তার মনিব বনে যাইনা। পৃথিবীতে কেউ কারো মনিব বা প্রভু নয়। সেটা হতে পারে পশুপাখির ক্ষেত্রে কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে নয়। বিভিন্ন যানবাহনে প্রায়শই একটি লেখা দেখতে পাওয়া যায়- আল্লাহ ভরসা। কিছু কিছু যানবাহনে লেখা দেখেছি, মালিক ভরসা।

আমার মধ্যে জানার একটা কৌতুহল- মালিক বলতে এখানে কি সৃষ্টিকর্তাকে বোঝানো হচ্ছে নাকি ঐ যানের মালিককে। যদি দ্বিতীয়টি হয়- তাহলে তা সত্যিই হাস্যকর হবে। কারণ, ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে গাড়ির মালিকের ভরসায়। কোনো দূর্ঘটনায় হয়তো উক্ত মালিক তাকে সুপারম্যানের মতো এসে উদ্ধার করবে।

সুতরাং আমাদেরকে এই হীন এবং ভুল মানসিকতা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। চাকরি যে করে সে চাকর নয়, কর্মী। পরিশ্রম করে সে তার বিনিময় নিচ্ছে।

যাই হোক, প্রতিটি মানুষের সববিষয়েই নির্দিষ্ট ধারণ ক্ষমতা আছে। সে কোনো রোবট বা যন্ত্র নয়। কাজ করার ক্ষেত্রেও- সেটা হতে পারে শারীরিক বা মানসিক। আট থেকে নয় ঘণ্টায় কাউকে একসঙ্গে দুই থেকে তিনজনের কাজ চাপিয়ে দেয়া অনুচিত। উক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে যা ঘটছে। অত্যধিক কাজের চাপে সে কিছুই ঠিকমতো সম্পাদন করতে পারছেনা। নিজেই মনঃপীড়ায় ভুগছে।

কাউকে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ করানোও একধরনের নির্যাতন বা জুলুম। এই জুলুম বা হয়রানির জন্য দোষীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। আর এসবকিছুই যদি করা হয় সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যেন অবশ্যই তার অর্জিত মুনাফার একটি অংশ কর্মীবাহিনীর মধ্যে বণ্টন করে দেয়।

আমার জানামতে ঐব্যক্তি এসব হয়রানি, অপমান সহ্য করতে না পেরে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েও বেশ কয়েকবার কেঁদেছে। এটা খুবই সহজাত যে- এভাবে ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনের ফলে যে কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ হতে বাধ্য। যা কখনোই কাম্য নয়। যেহেতু এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

সুতরাং কর্মক্ষেত্রে অবশ্যই সকলকে একটি স্বাস্থ্যকর এবং আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, তার প্রতিষ্ঠানে যে চাকরি করছে সে কোনো ভৃত্য নয়, সহযোগী।

এই প্রতিষ্ঠানের বাইরে ঐ কর্মীটিরই হয়তো বিশাল একটি জগত আছে যা উক্ত প্রতিষ্ঠানের ছোট গন্ডি থেকে অনেক বড়। একজন কর্মী তার পরিশ্রমের বিনিময়ে আশা করে উপযুক্ত সম্মান ও পারিশ্রমিক। চাকরিক্ষেত্রে মানসিক নির্যাতন রোধে আসলে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তবে বাংলাদেশ শ্রমআইনে কর্মীর মানসিক নির্যাতনরোধে কঠোর কিছু ধারা সংযোজন করা যেতে পারে।

লেখক ও সাহিত্যিক