গান্ধীবাদী আবদুল্লাহ ও অগ্নিদগ্ধ চা-দোকানি

Print Friendly, PDF & Email

১৯৪৬-এর অক্টোবরে নোয়াখালীর নারকীয়তার পর মহাত্মা গান্ধী তাঁর শান্তি মিশন নিয়ে নোয়াখালী আসেন। তিনি এ কালের প্রাজ্ঞ ও জনবান্ধব রাজনীতিকদের মতো অপরাহ্ণে মিডিয়ার সামনে প্রবল উত্তেজনাকর বক্তব্য দেওয়া পছন্দ করতেন না। আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলতেন। অবিচারের প্রতিবাদে যেখানে আইন অমান্য প্রয়োজন, সেখানে যথাযথ ঘোষণা দিয়েই আইন অমান্য করে সত্যাগ্রহ করতেন। নোয়াখালীতে এসে গান্ধীজি সেখানকার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং বিভিন্ন থানার ওসিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন। তখন নোয়াখালীর পুলিশ সুপার ছিলেন এম এ আবদুল্লাহ। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস বা আইপিএসের সদস্য। অতি সৎ, দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ অফিসার। মাঝেমধ্যেই তিনি গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর ক্যাম্পে গিয়ে দেখা করতেন। তাঁর অভিযোগ শুনতেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন। আবদুল্লাহর কাজে গান্ধীজি খুবই প্রীত হন। তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মে। তিনি গান্ধীর ভক্তে পরিণত হন। মাছ-মাংস খাওয়া ছেড়ে দেন। নিরামিষ ধরেন এবং আমৃত্যু তিনি নিরামিষাশী ছিলেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি তাঁর মৃত্যু হয়।
আবদুল্লাহ পঞ্চাশের শুরুতে ঢাকার সিটি এসপি ছিলেন, এখন যা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের পদ। আমরা তখন স্কুলছাত্র। গান্ধীবাদী আবদুল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার কথা শুনে আমরা শিহরিত হতাম। সেকালে সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহার হতো না। কোনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা খুব বেশি হলে তাঁদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দিতেন গাড়িতে। ঢাকা শহরই ছিল তখন একটুখানি। সব কটি স্কুলই ছিল দু-আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে। কোনো সরকারি জিপে কোনো স্কুলছাত্রছাত্রীকে যাতায়াত করতে দেখলে আবদুল্লাহ তাকে থামাতেন। গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে তাকে বলতেন, হেঁটে বাড়ি যাও, এ গাড়ি তোমার বাবার অফিসের কাজে ব্যবহারের জন্য, তোমার ব্যবহারের জন্য নয়। মেয়েদের পর্যন্ত তিনি গাড়ি থেকে নামিয়ে চার আনা পয়সা দিয়ে একটি রিকশা ভাড়া করে দিয়েছেন তাকে বাড়িতে বা স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এসপি আবদুল্লাহ তাঁর চেয়ে উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তা, এমনকি সচিব পর্যায়ের অফিসারের ছেলেমেয়েদেরও সরকারি গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি হয়ে ওঠেন সরকারি গাড়ি অপব্যবহারকারীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। কিন্তু সেকালের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ন্যূনতম মূল্যবোধ থাকায় তাঁকে বিপদে পড়তে হয়নি। ওএসডি বা পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি হওয়া থেকে বেঁচে গেছেন।
আবদুল্লাহরা ছিলেন দুই ভাই—আবদুল্লাহ ও সাদুল্লাহ। কলকাতার মানুষ। আধা উর্দুভাষী। আবদুল্লাহ ছিলেন ব্যাচেলর। থাকতেন কাকরাইল সার্কিট হাউসে। তাঁর প্রিয়জনের মধ্যে ছিল গোটা আট-দশ বিড়াল। ওই বিড়াল নিয়ে আপত্তি তোলেন সার্কিট হাউসের অন্যান্য অফিসার। তিনি ডিআইজি হয়েছিলেন। একপর্যায়ে বিড়াল নিয়ে গোলমাল বাধে গভর্নর মোনায়েম খানের সঙ্গে। চিঠি চালাচালি হয়। আবদুল্লাহ আগাম অবসর নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যারিস্টার হয়েছিলেনও। তিনি থাকতেন ইস্কাটনে ভাড়াটে বাড়িতে। তাঁর ভাই চলে গিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। গান্ধীভক্ত আবদুল্লাহ আজীবন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল ছিলেন। গান্ধীজির নোয়াখালীর কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে একটি স্মৃতিকথামূলক বই লেখার ইচ্ছা তাঁর ছিল, কিন্তু সম্ভবত তা আর হয়ে ওঠেনি।
পুলিশ বিভাগের সব কর্মকর্তাই আবদুল্লাহর মতো সত্য ও ন্যায় নিয়ে থাকবেন, তা ভাবা ঠিক নয়। কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের বিপরীতে অবস্থান নেবেন, সেটাও মানা যায় না। আর কেউ যদি দুর্বৃত্ত হয়ে ওঠেন, তা ঘোরতর অন্যায়। পুলিশ কর্মকর্তার কাজ অপরাধী ও দুর্বৃত্তকে ধরে আইন-আদালতের কাছে সোপর্দ করা। রাষ্ট্র তাদের বিচার করে উপযুক্ত শাস্তি দেবে। পুলিশের কাজ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা পর্যন্ত। অবশিষ্ট কাজ করবে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
পুলিশ একটি অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী এবং আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় খুবই ক্ষমতাবান। অন্যদিকে একজন দরিদ্র চা-দোকানি অতি দুর্বল। পুলিশের সোর্স বলে একটি প্রজাতি বহুকাল থেকেই পুলিশ বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করে। অপরাধীকে শনাক্ত করতে পুলিশের সোর্সের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। পুলিশ ও তার সোর্স যোগসাজশ করে যদি কোনো অপরাধ ঘটায়, সে অপরাধ কোনো সাধারণ নাগরিকের অপরাধের চেয়ে গুরুতর। এবং ক্ষমার অযোগ্য। ক্ষমা করা যায় না এ জন্য যে তাঁদের রাষ্ট্র বেতন-ভাতা দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে অপরাধীদের দমন করতে, তা না করে তাঁরা নিজেরাই অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন। এবং সে অপরাধও মুহূর্তের উত্তেজনাবশত নয়, সুপরিকল্পিতভাবে স্বার্থসিদ্ধির জন্য।
কোনো পুলিশ অফিসার বা সোর্স স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি করে যদি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বসেন, সেটা অপরাধ। সে অপরাধের দায় পুলিশ বাহিনীর ওপর বর্তায় না। কিন্তু কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা তাঁর সোর্স জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করতে গিয়ে যদি কোনো চা-দোকানিকে তাঁর জ্বলন্ত চুলার মধ্যে ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মারেন, সে খুনের দায় ওই বাহিনীর ওপর অবশ্যই বর্তায়। তাতে প্রমাণিত হয় ওই বাহিনীর কেউ কেউ ঠিকমতো দায়িত্ব পালন তো করছেনই না বরং অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। বাহিনী হিসেবে নির্দোষ থাকতে চাইলে কর্তৃপক্ষের কর্তব্য তৎক্ষণাৎ দোষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং তারপর যথাযথ শাস্তির জন্য তাঁকে আইনের হাতে সোপর্দ করা। তা না করে অপরাধ আড়ালের চেষ্টা গর্হিত ও জঘন্য কাজ।
পুলিশ বাহিনী নিয়ে এত কথা হওয়া সত্ত্বেও আমি বিশ্বাস করি না সবাই দুর্নীতিতে লিপ্ত। সম্প্রতি কোনো এক মাসের শেষ দিকে আমি একজন সহকারী পুলিশ সুপার পর্যায়ের কর্মকর্তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁদের সংসার। তাঁরা রাতে খেতে বসেছিলেন। ডিম আর ডাল দিয়ে তাঁরা ভাত খাচ্ছিলেন। আভাসে-ইঙ্গিতে আলাপ করে যা বুঝলাম তা হলো, মাসের শেষের দিকে ঠিকমতো বাজার করা সম্ভব হয় না। কলেজে পড়ুয়া ছেলেমেয়ের খরচ চালানোর পর সংসার চালানোই কঠিন। বছরে রোজার ঈদে ছাড়া নতুন কাপড় কেনা সম্ভব হয় না। বাস্তবতা হলো, সততা-অসততা কোনো পেশাজীবীর গায়ে লেখা থাকে না। আজও পুলিশ বাহিনীতে সৎ ও নীতিমান মানুষ আছেন। তাঁদের বাহিনীর কেউ যখন অপরাধী সাব্যস্ত হন, তখন নিশ্চয়ই তাঁদের মাথা লজ্জায় হেঁট হয়। আমার পরিচিত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা সৎ এবং দক্ষ। মানুষের প্রতি রয়েছে তাঁদের শ্রদ্ধাবোধ। সম্ভবত তাঁরা পুলিশ পদক পান না।
পুলিশ মানুষ, তাঁর পক্ষে অপরাধ করা অসম্ভব নয়। কিন্তু কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তাঁর এক মজাদার শাস্তি আছে। সে শাস্তির নাম ক্লোজ, যার বাংলা করেছি আমরা ‘প্রত্যাহার’। দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে দূরে রাখা। যে অপরাধ করলে কলিমুদ্দিন ও হারাধন সাহার কোমরে দড়ি পড়ে, সেই অপরাধ করে পুলিশ দিব্যি দাঁত কেলিয়ে হাসেন। বসে বসে বেতন-ভাতা পান। এমনকি কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে যখন সাসপেন্ড করা হয়, তিনি শুধু মূল বেতনটা পান—অন্য কোনো ভাতা নয়। পুলিশ বেতন-ভাতাসহ দায়িত্ব থেকে ‘প্রত্যাহার’ হন। ক্ষতি শুধু থানায় থাকলে উপরি আয় হয়, ‘ক্লোজ’ থাকলে সেটা বন্ধ। ধর্ষণের মতো চরমতম অপরাধের অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে, তাঁকে শুধু ‘ক্লোজ’ করলেই হলো।
বিরোধী দলের তথাকথিত আন্দোলন এবং ৫ জানুয়ারির নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পরে অবস্থার অস্বাভাবিক অবনতি ঘটেছে। গ্রেপ্তার-বাণিজ্যে অতিষ্ঠ বিরোধী দলের তৃণমূলের কর্মী ও সমর্থকেরা। থানা-হাজতে নির্যাতন, পুলিশি হেফাজতে নারীর ওপর যৌন হয়রানি, ইয়াবা থেরাপি, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ অতি মাত্রায় বেড়ে গেছে। অভিযুক্ত পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তাও নয়। ‘পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ছোট-বড় বিভিন্ন বিচ্যুতি-অপরাধে ৯ হাজার ৯৫৮ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যকে বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ৭৬ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে থানা ও আদালতে মামলা হয়েছে।…২০১৫ সালের ১২ মাসে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে।’ [সমকাল, ৭ মার্চ ’১৫]
পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার মামলা করবে কোথায়? থানা মামলা নিতে চায় না। নিলেও ফরিয়াদি গুম হওয়ার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়ায়। আদালতে হাজিরা দেয় না। যা দরকার তা হলো উচ্চপর্যায়ের আশকারা বন্ধ হওয়া এবং দ্রুত বিচারের আদালতে বিচার করে রায় বাস্তবায়ন।
চুলার আগুনে পুড়িয়ে মিরপুরের চা-দোকানি বাবুল মাতবরকে হত্যা করার অভিযোগে মিডিয়ার প্রবল চাপে শাহ আলী থানার ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে। মানুষ ‘ব্যবস্থা’ দেখতে চায় না, শাস্তি দেখতে চায়। বাংলার মানুষের কপাল পোড়া, তাই স্টোভের আগুনে ফেলে তাদের পুড়িয়ে মারা হয়। বাংলার মানুষ কার আগুনে পুড়ে মরল সেটা মুখ্য নয়, পুড়ে মরছে সেটাই বাস্তবতা।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেও সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দরকার। চাঁদাবাজিতে শিল্প-কারখানার মালিক ও ঠিকাদার-ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ। পুলিশের সহায়তা তাঁদের প্রয়োজন। তা না পেয়ে যদি তাঁরা পুলিশের হাতেই নিগৃহীত হন, তাতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমাজেও থাকবে না শান্তিশৃঙ্খলা। আমরা গান্ধীবাদী আবদুল্লাহকে পাব না। কিন্তু ১৬-১৭ কোটি মানুষের দেশে দু-এক লাখ ন্যায়পরায়ণ পুলিশ সদস্য পাব না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।