আইএসকে ঠেকাব কীভাবে?

Print Friendly, PDF & Email

যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির যে এক ডজন নেতা-নেত্রী তাঁদের দলের পক্ষে ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে লড়তে চান, তাঁরা কে কার চেয়ে বেশি লড়াকু, তা প্রমাণে একেবারে গলদঘর্ম হয়ে পড়েছেন। গত সপ্তাহে লাস ভেগাসে তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন তাঁদের দলের পাঁচ নম্বর ‘ডিবেটে’। সেখানে সবার এক কথা, ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) ঠেকাতে হেন কাজ নেই, যা করা যাবে না। তা করতে গিয়ে যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধে, তাতেও কুছ পরোয়া নেই।
অনুমান করি, এর অধিকাংশই বাত-কি-বাত, প্রাক্-নির্বাচনী প্রচারণায় নিজ নিজ সমর্থকদের গা গরম করার চেষ্টা। আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থার এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত কে দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নির্ণয়ের জন্য ভোটাভুটির দেড়-দুই বছর আগে থেকে নিজেদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলে দলের সমর্থকদের নিজের পক্ষে টানতে। এর নাম ‘প্রাইমারি’। সমস্যা হলো, এই প্রাইমারির দৌড় পেরোতে রিপাবলিকানরা ঠিক সেই কাজটাই করছে, যা আইএস মনে-প্রাণে চাইছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে চলতি যুদ্ধটাকে তারা মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে ধর্মযুদ্ধ বলে প্রমাণে ব্যস্ত। অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি যা তারা চায়, তা হলো সিরিয়ায় ও ইরাকে, যেখানে আইএস তথাকথিত ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে তাদের ঠেকাতে মার্কিন সৈন্য পাঠানো হোক। তাহলে খেলাটা জমে ভালো।
ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে জেব বুশ, সবাই ঠিক তা-ই চাইছেন। শুধু বোমা মেরে আইএসকে হটানো যাবে না। ওবামা প্রশাসনের সেই চেষ্টা, সিনেটর টেড ক্রুজের ভাষায়, বড়জোর ‘ছবি তোলার সুযোগ’। এখনই সৈন্য পাঠাও, ইরাক ও সিরিয়ার তেল দখল করো, সেখানে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করো।
মার্কিন সৈন্য না পাঠালে শুধু বিমানযুদ্ধে আইএসকে যে ঘায়েল করা যাবে না, অধিকাংশ আকেলমান্দ লোক তাতে একমত। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে সরানো সম্ভব হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের পর, প্রায় দেড় লাখ পদাতিক সৈন্য সরাসরি সে যুদ্ধে অংশ নেয়। ইরাকে সাদ্দাম সরকারের পতন এবং সেখানে বিদেশি সৈন্যের উপস্থিতির প্রতিক্রিয়াতেই জন্ম নেয় সুন্নি বিদ্রোহ। আর মার্কিন সৈন্য সরে যেতে না-যেতেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে আইসিস বা আইএস। সেই আইএসকে তাড়াতে না–হয় আবারও দেড় লাখ সৈন্য পাঠানো গেল। কিন্তু কত দিন তাদের সেখানে আসন গেড়ে বসে থাকতে হবে জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে?
এ কথায় এখন সবাই একমত, বিশ্বজুড়ে যে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে, তার প্রধান কারণই হলো আমেরিকার ইরাক অভিযান। ‘শুদ্ধ ইসলামি রাষ্ট্র’ গঠনের স্বপ্ন থেকে একধরনের মৌলবাদী তৎপরতা মিসর থেকে পাকিস্তান, সারা ইসলামি বিশ্বে বরাবরই ছিল। কিন্তু আরবের মাটিতে বিদেশি সৈন্যের উপস্থিতি তাতে যেন ঘৃতাহুতি দিল। সেই আগুনের বহ্ন্যুৎসব এখন ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সর্বত্র।
ইসলামি জঙ্গিবাদ ঠেকানোর উপায় হিসেবে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ মোটের ওপর যে ব্যবস্থা নিয়েছে তা হলো: যেখানে জঙ্গি দেখবে সেখানেই বোমা ফেলো। সিরিয়া, ইয়েমেন, পাকিস্তান ও মালি—সবখানে একই দৃশ্য। সম্প্রতি সাপ্তাহিক নেশন পত্রিকায় ভাষ্যকার ইউসুফ মুনাওয়ার আমেরিকার এই নীতিকে চুলায় পানি গরম করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। গনগনে চুলায় পানি গরম করতে গেলে তাতে একসময় বুদ্বুদ দেখা দেবে। জঙ্গিবাদ হলো ওই বুদ্বুদের মতো। হাঁড়িতে যখন বুদ্বুদ ফোটে, আমেরিকা অমনি খুন্তি হাতে নিয়ে সেই
বুদ্বুদ ফুটো করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এক বুদ্বুদ থামে তো আরেক বুদ্বুদ ফোটে। কত বুদ্বুদ তারা থামাবে? অথচ ভিন্ন ভিন্ন বুদ্বুদ থামানোর বদলে যদি সে বুদ্বুদের কারণ—ওই জ্বলন্ত চুলা—নেভানোর ব্যবস্থা করত, তাহলে ফল পাওয়া যেত অনেক দ্রুত ও সহজে।
আমার নিজের ধারণা, প্রেসিডেন্ট ওবামা এই সহজ সত্যটা বুঝতে পেরেছেন। চারদিক থেকে চাপ সত্ত্বেও তিনি যে এখনো আইএসের বিরুদ্ধে মার্কিন পদাতিক সৈন্য পাঠাননি, তার কারণ তিনি জানেন এর ফলে আইএসকে নতুন জীবন দান করা হবে। শুধু সামরিক ব্যাপার হলে আইএসকে ঠেকানো আমেরিকার পক্ষে কঠিন হতো না। তিনি জানেন, সে বিজয় ধরে রাখতে হলে দেড় লাখ না হোক, তার অর্ধেক সৈন্য স্থায়ীভাবে ওই এলাকায় রেখে দিতে হবে। ঠিক এই ভুলটি করেই জর্জ বুশ আইএসের জন্ম দিয়েছিলেন।
আইএসের নিয়মিত সৈন্যসংখ্যা ৩০-৩৫ হাজারের বেশি হবে না। আমেরিকার মতো সর্বাধুনিক সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে টিকে থাকার ক্ষমতা আইএসের নেই। অথচ তারপরও তারা তো দিব্যি চরিয়ে খাচ্ছে, সিরিয়া ও ইরাক মিলিয়ে রীতিমতো বিরাট একটা অঞ্চল তারা নিজেদের দখলে নিয়েছে। তার কারণ, আইএস তার জীবনীশক্তি আহরণ করে বিদেশি আগ্রাসন ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতার ব্যাপারে ওই অঞ্চলের সুন্নিদের ক্ষোভ থেকে।
তাহলে সমাধান কোথায়? এ প্রশ্নের একটা উত্তর মিলেছে জাতিসংঘ থেকে। গত শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে সিরিয়ার অব্যাহত গৃহযুদ্ধ থামাতে একটি শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়েই আইএস সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। ফলে প্রথম কাজই হলো সেই গৃহযুদ্ধ থামানো। ওয়াশিংটন, মস্কোসহ সব পক্ষই একমত হয়েছে যে আপাতত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে রেখেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। বিশ্বের এ দুই পরাশক্তি সেখানে ইতিমধ্যে এক নতুন সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়েছে। উভয়েই বলেছে, আইএস তাদের শত্রু, কিন্তু সেই শত্রু ঘায়েলের জন্য কোনো অভিন্ন রণকৌশল অবলম্বনের বদলে তারা যে যার নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলে ব্যস্ত। জাতিসংঘে গৃহীত নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে এই অবস্থা বদলানোর একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। যদি মস্কো ও ওয়াশিংটন তাদের দেওয়া কথার খেলাপ না করে, তাহলে উভয়ের সামরিক চাপের একমাত্র লক্ষ্য হবে আইএসের পতন।
আইএসের সামরিক পতন নিশ্চিত হলেও তার আদর্শগত পতন অর্জিত হবে না। কারণ, আইএস কেবল একটি সামরিক আন্দোলন নয়, তার আসল জোর আদর্শগত বা ‘আইডিওলজিক্যাল’। পাল্টা ‘আইডিওলজি’ রাতারাতি গজানো সম্ভব নয়, কিন্তু যা সম্ভব তা হলো, ইউসুফ মুনাওয়ার যে জ্বলন্ত চুলার কথা বলেছেন, তার আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করা।
এ কথার অর্থ, ঠিক যেসব কারণে আইএস আসন গেড়ে নিতে পেরেছে, নজর দিতে হবে সেসবের দিকে। সর্বাগ্রে প্রয়োজন হবে ওই অঞ্চলের সব জাতি-গোষ্ঠীর ন্যায্য রাজনৈতিক স্বাধিকারের নিশ্চয়তা। ইরাকে শিয়া নেতৃত্ব সে দেশের সুন্নি জনগোষ্ঠীর অধিকার মানতে অস্বীকার করেছে। সিরিয়ায়ও আসাদ ব্যস্ত থেকেছেন সব ক্ষমতা নিজের আলাভি-শিয়াদের হাতে জমা রাখতে। অন্যদিকে, ইরাকের উত্তরে কুর্দিরা দীর্ঘদিন থেকে নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার দাবি করে আসছে। তুরস্ক নাখোশ হবে ভেবে কৃর্দিদের সেই দাবি পরাশক্তিগুলো গ্রাহ্য করেনি।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থামার পর একটি জরুরি কাজ হবে ওই অঞ্চলের সব জাতি-গোষ্ঠীর ন্যায্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি জানিয়ে এক ব্যাপক, বহুজাতিক ‘সামাজিক-রাজনৈতিক চুক্তি’। এই চুক্তি বাস্তবায়নের চেহারা কী হবে, এই মুহূর্তে তা বলা কঠিন। তবে ইরাক ও সিরিয়া উভয় দেশেই যদি জাতিভিত্তিক বিভক্তি মেনে একটি ফেডারেল ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাতে সমাধানের একটি পথ উন্মুক্ত হবে, এ কথা অনেক নিরপেক্ষ বিশ্লেষকই বলা শুরু করেছেন।
আমেরিকা বা রাশিয়াকে যদি এই ‘গ্র্যান্ড বারগেইনের’ নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠবে। এ দুই শক্তির ব্যাপারেই ঐতিহাসিক কারণে ওই অঞ্চলের লোকদের গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন ও মস্কো যদি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এমন একটি ‘গ্র্যান্ড বারগেইনের’ পেছনে দাঁড়ায়, তাহলে এই কঠিন কাজটির বাস্তবায়ন অনেক সহজ হয়ে আসে।
শুধু এ দুই পরাশক্তি নয়, আঞ্চলিক শক্তিসমূহ—যেমন ইরান, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশসমূহ—তাদেরও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে আইএস ছাড়াও এক বড় আপদ হলো ইরান ও সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অন্যকে রুখতে এরা নিজেদের ধ্বংস করতে প্রস্তুত, সেই প্রমাণ তারা ইতিমধ্যে রেখেছে। গোড়া থেকেই যদি এ দুই নাটের গুরুকে প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে স্বল্পমেয়াদি হিসাবে স্থিতিশীলতা অর্জন অসম্ভব নয়।
সৌদি আরব ইরানকে ঠেকানোর লক্ষ্যে এরই মধ্যে এক ৩৪-জাতি সামরিক জোট গঠনের কথা ঘোষণা করেছে। এর ফলে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে ওই অঞ্চলের শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব কাটানোর একমাত্র উপায় এ দুই দেশের ‘অভিভাবকদের’ তাদের ক্লায়েন্ট দেশের মাধ্যমে নিজেদের ‘প্রক্সি’ যুদ্ধ চালানোর পুরোনো অভ্যাসটা বদলানো।
আইএস যে একা আমেরিকার সমস্যা নয়, সে রাশিয়ার জন্যও মস্ত মাথাব্যথা, সে কথা এ দুই দেশই স্বীকার করে নিয়েছে। জাতিসংঘে সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণকালে তাদের বক্তব্যে সে কথার স্বীকৃতি মিলেছে। বাস্তবতা মেনে নিয়েই যে তারা অভিন্ন ভাষায় কথা বলছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন সৌদি আরব ও ইরানের সামনে সেই একই সত্যটা তুলে ধরার দায়িত্ব যদি যথাক্রমে ওয়াশিংটন ও মস্কো গ্রহণ করে, অনুমান করি, তাহলে তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে ঘোড়দৌড় সাময়িকভাবে হলেও থামানো যাবে।
আইএসকে মোকাবিলায় মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যদি সত্যি সত্যি ঐকমত্য অর্জিত হয়, তাহলে শুধু জঙ্গিবাদের উত্থানই ঠেকানো সম্ভব হবে না, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে অনেক প্রশ্নেরই সমাধান অর্জন সম্ভব। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এক মস্ত বিপদ সামনে রেখে তারা এক হয়েছিল। আজকের সংকট তার চেয়ে বিন্দুমাত্র কম নয়।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।