রক্তাক্ত হৃদয়ে তা–ও বলি, তা–ও লিখি

Print Friendly, PDF & Email

বাবা আর আমার শেষ ছবিটা আমার ভীষণ প্রিয় ছবি। ছবিটার দিকে অনেক সময়ই তাকাতে কষ্ট হয়—বিশেষ করে এই সময়টায়। ছবির বাবাকে বয়সে আমি পেরিয়ে গেছি আগেই। কিন্তু তাঁর মুখের দিকে তাকালে আমার সমস্ত অস্তিত্ব ফিরে যায় তিন বছরের নীপার কাছে। দুই চোখ বেয়ে ঝরে অপ্রাপ্তির অশ্রু, হৃদয়ে চলে অবিরাম রক্তক্ষরণ! ৪৪ বছর পরেও!

১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১; আমার বাবা শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীকে অস্ত্রের মুখে ধরে নিয়ে গেল ঘাতকেরা। তাঁর ক্ষতবিক্ষত, প্রাণহীন দেহ বাংলাদেশের বুকে পেল আশ্রয়, তার রক্ত পতাকার লাল-সূর্যে পেল ঠিকানা। বাবাকে নিয়ে কিছু লিখতে গেলে কলম থেমে যায়, চেতনা আড়ষ্ট হয়ে যায়, রক্তাক্ত হয় হৃদয়।

তা–ও বলি, তা–ও লিখি। সেই লেখারও সবচেয়ে বড় প্রেরণা আমার বাবা আর তাঁর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন দেশের স্বাধীন প্রজন্ম—যারা ’৭১ দেখেনি আর কিছুদিন পর যুদ্ধের চিহ্নও আর দেখবে না। তারা আমার লেখা পড়বে, আমার বাবার রক্তমাখা কাপড় দেখবে আর চিনবে ’৭১-কে এবং নিখাদভাবে ভালোবাসবে বাংলাদেশকে আর মুক্তিযুদ্ধকে। তাই ধরতেই হয় কলম—আরও কিছু কারণে!

বাংলাদেশের মানুষের মতো এত আগে থেকে ইসলাম ধর্মের অপব্যবহারকারী, সন্ত্রাসী/ধর্ম ব্যবসায়ীদের মনে হয় কেউ চেনে না। সারা বিশ্ব চমকে উঠছে যেসব নৃশংসতা দেখে, তা আমাদের ৪৪ বছর আগের ইতিহাস। আমরা ১৯৭১—এই রক্তমাখা ছুরি আর মানুষের শিরশ্ছেদ করা মাথা দেখেছি। অনেক মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেরই তা জানতে, বুঝতে সময় লেগেছে।

পাশ্চাত্যের সরকারগুলো এসব ব্যাপারে ইচ্ছা করে বোকা সেজেছে। মানবাধিকারের নামে খুনিদের পক্ষেই এরা সাফাই গেয়েছে। এমনকি তারা বিভিন্ন দেশের যুদ্ধাপরাধীদের, সন্ত্রাসীদের মহা-আদরে আশ্রয় দিয়েছে।

চৌধুরী মঈনুদ্দীন, আশরাফুজ্জামান আশ্রয় পেয়েছে ঝটপট! আশ্রয় পাওয়া জল্লাদেরা উদার গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়েছে, ‘উদার’ লেবাস ধরেছে। পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা এখন সবাই দেখছে, বিশ্বজুড়ে! পাশ্চাত্যের সরকারগুলো বুঝেও তা বোঝে না।

যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের দ্বৈতনীতি আরও অদ্ভুত! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুবিচার নিয়ে তাদের অনেক অহংকার! ৭০ বছর পরেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপরাধীদের শাস্তি হয়—কখনো জার্মানিতে, কখনো ইসরায়েলে—বিচার হয় সবার—ভয়ংকর জল্লাদ থেকে সামান্য প্রহরী পর্যন্ত কেউ রেহাই পায় না। সেটারও প্রশংসা পাশ্চাত্যব্যাপী! অথচ বাংলাদেশের ব্যাপারে তারা প্রচণ্ড সমালোচনামুখর!

বিজিত জার্মানির মতো নিজেকে শোধরানোর অসাধারণ প্রয়াস পাকিস্তানের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্রের কাছ থেকে আশা করা যায় না। জার্মানির উদাহরণ থেকে পাকিস্তান শেখেনি, শিখবে না। তার প্রমাণ তারা দিল আবার।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে তিরস্কার করে ‘যুদ্ধাপরাধ হয়নি’ এমন দম্ভোক্তি করার নীচতা দেখাল তারা। তবে পাকিস্তান আর পাশ্চাত্য কী ভাবল, কী বলল তাতে আমার কিছুই যায়-আসে না। আমার সমস্যা বিভীষণদের নিয়ে।

বাংলাদেশ বিজিত নয়, বাংলাদেশ বিজয়ী। সেই বিজয়ী দেশের কিছু মানুষ ধৃষ্টতা দেখায় ’৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে। কার স্বার্থে ৪৪ বছরের শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে নিক্তি দিয়ে তাজা রক্ত মাপার অপচেষ্টা করে তারা? বিজয়ী দেশে কোন সাহসে ‘দানবাধিকারের’ পক্ষে সাফাই গায়?

কোন অধিকারে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে তারা অযথা পরিস্থিতি ঘোলাটে করে, বিচার নিয়ে এত প্রশ্ন তোলে?
চোখের জল মুছে তাই আমাদেরই আবার কলম ধরতে হয়। আবার বলতে হয় ‘ঘাতক’ কোন অচেনা, অদেখা ধারণা নয়। গোলাম আযম, সাঈদী, নিজামী, মুজাহিদ, সাকা—এরাই ঘাতক, এরাই সন্ত্রাসী, এরাই ধর্ষক, এরাই দানব।

পাকিস্তান আজ যাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন, তারা ও তাদের তৈরি নব্য রাজাকাররাই সহিষ্ণু-উদার বাংলাদেশের শত্রু! বিশ্বজুড়ে মানবতার শত্রু! কলম আরও ধরতে হয় যুদ্ধাপরাধীদের হয়ে সাফাই গাওয়া ভণ্ড-প্রতারকদের বিরুদ্ধে।

সময় এসেছে সেই অপশক্তির মুখোমুখি দাঁড়ানোর। সময় এসেছে তাদের শক্তভাবে বলার, ‘রক্ত দিয়ে কেনা এই বাংলাদেশে আমরা হারিয়ে যাব না, হেরেও যাব না!’
ফারজানা চৌধুরী: শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীর কন্যা।