আমরা কোথায় আছি?

Print Friendly, PDF & Email

১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। জাতিসংঘ এবার বিশেষভাবে এ দিবসকে পালন করার উদ্যোগ নিয়েছে, কারণ মানবাধিকারকে সংজ্ঞায়িত করা এবং তা বাস্তবায়নে জাতিসংঘের যে মানবাধিকার আন্দোলন, শিগগিরই তা ৫০ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে।

জাতিসংঘ এবারের মানবাধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, ‘আমাদের স্বাধীনতা-আমাদের অধিকার, চিরন্তন’। এবারের মানবাধিকার দিবসকে ঘিরে বছরব্যাপী ব্যাপক প্রচারণাও হাতে নিয়েছে জাতিসংঘ।

মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক দলিলগুলো যেহেতু অধিকার চর্চার স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাই এ বছরের প্রতিপাদ্যে জাতিসংঘও অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে সর্বদা যেন আমাদের স্বাধীনতা অটুট থাকে, তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

কিন্তু ২০১৫ সালে বাংলাদেশে অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে ‘স্বাধীনতা’ বিষয়টি ছিল উপেক্ষিত। জীবনের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে জীবনধারণের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমত পোষণ করা থেকে শান্তিপূর্ণভাবে তা প্রকাশ করতে পারার স্বাধীনতা—সবকিছুই হয়েছে নিদারুণভাবে উপেক্ষিত।

২০১৪ সালের মতো ২০১৫ সালও শুরু হয় রাজনৈতিক সহিংসতা দিয়ে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সেই নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচনের দাবিতে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি সমাবেশ অনুষ্ঠানের কর্মসূচি দেয় বিরোধী দলগুলো।

সরকারের পক্ষ থেকে সেই কর্মসূচি পালনের অনুমতি না দিয়ে বিএনপির নেত্রীকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সম্ভাব্য নাশকতা এড়ানোর জন্যই সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং বিএনপির নেত্রীকে সমাবেশে যেতে দেওয়া হয়নি।

এর পরদিন থেকেই সারা দেশে শুরু হয় বিরোধী দলের ডাকা লাগাতার অবরোধ এবং একই সঙ্গে নাশকতা। টানা ৬৬ দিন ধরে চলে এই অবরোধ। অবরোধ চলাকালীন পেট্রলবোমা ও আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান ৭০ জন।

এসব হামলা থেকে রক্ষা পাননি নারী-শিশু-বৃদ্ধ। হামলা হয়েছে স্কুলে, পাঠ্যপুস্তকবাহী গাড়িতে। হত ও আহত ব্যক্তিদের প্রায় প্রত্যেকে ছিলেন সাধারণ মানুষ, বেশির ভাগই দরিদ্র, বাস ও ট্রাকের চালক, সহকারী—রাজনীতির সঙ্গে তাঁদের সরাসরি সংস্রব ছিল না।

এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর বলপ্রয়োগের মাত্রাও এ সময় ভয়ংকরভাবে বেড়ে যায়। আমাদের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, বছরে অক্টোবর পর্যন্ত গুমের শিকার হয়েছেন ৪৭ জন।

নভেম্বর পর্যন্ত কথিত ‘ক্রসফায়ার’ আর বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন ১৫৩ জন। উল্লেখ্য, এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যাঁরা শিকার হয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদিও এসব হত্যাকাণ্ডের দায় অস্বীকার করেছে, কিন্তু অধিকাংশের স্বজনের অভিযোগ, তাঁদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়েই ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে চলতি বছরের চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। একদিকে মুক্তমনা লেখক-প্রকাশকদের ওপর হামলা এবং তাঁদের নৃশংসভাবে হত্যা, অন্যদিকে আইনি, প্রশাসনিক ও বিচারিক পদ্ধতিতে ভিন্নমতকে রুদ্ধ করার চেষ্টা। সর্বোপরি ভিন্নমতের প্রতি যে

ব্যাপক অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়েছে, তাকে নিরুৎসাহিত না করে বরং প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে। চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচজন মুক্তমনা

লেখক-প্রকাশক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, আহত হয়েছেন দুজন আর চরম আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন অনেকে। এর মধ্যে নতুন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে ড. আনিসুজ্জামান ও হাসান আজিজুল হকের মতো প্রথিতযশা আরও অনেক লেখক-বুদ্ধিজীবীকে।

এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কাউকে কাউকে আটক করা হয়েছে, কিন্তু তারাই যে প্রকৃত হত্যাকারী, সে ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিচারকার্যও চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। উপরন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নানা সময়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যার মাধ্যমে অপরাধীদের উৎসাহ পাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্বকারী বৈশিষ্ট্য, বিশেষত ৫৭ ধারা নিয়ে আমরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছি। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে এই আইনে আটক করা, রিমান্ডে নেওয়া। পরে চটজলদি জামিন মঞ্জুর করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

অভিযোগ ওঠে যে প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থবিরোধী অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁকে এই আইনে আটক করা হয় ও রিমান্ডে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে তাঁর জামিনের ব্যবস্থা হয়।

আইন ও আদালতকে মর্জিমাফিক চালানোর এ ধরনের আরেকটি ঘটনা—পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা অদম্য ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকদের আটক করা, রিমান্ডে নেওয়া এবং প্রায় দুই মাস পর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাঁদের জামিন লাভ।

উভয় ঘটনাতেই ভুক্তভোগীদের জামিন লাভ স্বস্তিকর বটে, কিন্তু এসব ঘটনায় যে প্রক্রিয়ায় আইন-আদালতসহ সংশ্লিষ্ট সবাই তাঁদের ভূমিকা রেখেছেন, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এ লেখা যখন লিখছি তখন ফেসবুক, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বন্ধের প্রায় এক মাস হতে চলল।

এ বছর মানব পাচারের এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে আমাদের সামনে। থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অসংখ্য গণকবরের সন্ধান লাভ, গভীর সমুদ্রে ভাসমান ক্ষুধার্ত রোগাক্রান্ত মৃতপ্রায় মানুষের ছবি-খবর, ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূলের কাছাকাছি

দরিয়ায় খাবার নিয়ে ক্ষুধার্তদের মারামারিতে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি—এসব খবর আমাদের সামনে এই বাস্তবতা হাজির করে যে বাংলাদেশের বেকার, ভাগ্যান্বেষী মানুষেরা দালালদের প্রলোভনে পড়ে, বৈধ ও সুগম পথে বিদেশে যাওয়ার উদ্যোগের স্থবিরতার কারণে এই ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ উপায়ে

মালয়েশিয়া যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে। এই দালালদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা আমরা দেখি না।
চলতি বছর জাতিসংঘের শিশু অধিকার রক্ষা কমিটিতে বাংলাদেশের শিশু পরিস্থিতির মূল্যায়ন হয়েছে। এতে শিশুকল্যাণে নেওয়া বিভিন্ন ভূমিকার

জন্য বাংলাদেশ কিছু সাধুবাদ পেয়েছে। কিন্তু শিশু হত্যার ক্ষেত্রে বর্তমান বছর বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। শুধু সংখ্যার দিকে থেকে নয়, যে ধরনের ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর পন্থায় শিশুদের হত্যা করা হয়েছে, তা সমাজের বিশেষ বৈকল্যকে ইঙ্গিত করে। যে শিশুদের নৃশংস কায়দায় হত্যা করা

হয়েছে, তাদের অনেকেই শিশু শ্রমিক। ২৯ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সাত দিনে সাতটি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। বছর শেষে আমরা দ্রুততার সঙ্গে রাজন, রাকিব, সাঈদ হত্যার বিচার সম্পন্ন হতে দেখছি বটে, কিন্তু শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো শিশুদের প্রতি আমাদের আরও অধিক মনোযোগ ও দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

সরকারদলীয় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বেপরোয়া আচরণ এবং তাঁদের দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা ছিল চলতি বছরের অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ, এ রকম সংঘর্ষ চলাকালে মায়ের পেটে শিশুর গুলিবিদ্ধ হওয়া, জনৈক সাংসদের গুলিতে

শিশুর আহত হওয়া, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির অপ্রাপ্তবয়স্ক ভাতিজার বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে পথচারীকে আহত করা এবং পরবর্তী সময় পুলিশের তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা—ইত্যাদি ঘটনা এই দুঃখজনক সত্যকে সামনে নিয়ে আসে যে—এ দেশে আইন সবার জন্য সমান নয়।

সভা-সমাবেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও এ চিত্র ছিল দুর্ভাগ্যজনক। বিরোধী দলগুলোকে কার্যত কোনো সভা-সমাবেশই করতে দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন অজুহাতে গ্রেপ্তার, জামিন না দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের মৌলিক স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। বর্ষবরণ উৎসবে নারীদের যৌন হয়রানির

প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশ, শিক্ষকদের দাবিদাওয়া প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন সমাবেশ—তা ভূমি রক্ষার আন্দোলনই হোক আর উৎসবের শোভাযাত্রাই হোক, অথবা সুন্দরবন রক্ষা অথবা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার

বিরোধিতায় আয়োজিত শান্তিপূর্ণ সভা-সভাবেশ—সবকিছুকেই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভন্ডুল করা হয়েছে, যা মেনে নেওয়া যায় না। সেপ্টেম্বরে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ছেলের সামনে মাকে নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতিবাদে পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনাটি ছিল নজিরবিহীন। এ ঘটনায় তিনজন নিহত হন এবং আরও অনেকে গুলিবিদ্ধ হন।

ধর্মীয় উগ্রপন্থার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার প্রবণতা চলতি বছরের আরেকটি উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর নামে দেশের ও বিদেশের মানুষকে হত্যা—হুমকি প্রদান, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং এসব নিয়ে সরকারের অস্বীকারের অথবা বিরোধীদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা আমাদের মনে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

ভারতের সঙ্গে বহু প্রতীক্ষিত স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর ছিল বর্তমান বছরের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর মাধ্যমে ভিনদেশের জঠর থেকে মুক্ত হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহল। প্রায় ৫৯ হাজার ছিটমহলবাসীর জন্য এটি ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সমতুল্য। কিন্তু ছিটের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি সমস্যাসহ তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাসহ আনুষঙ্গিক মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতি কতটা নজর দেওয়া হয়, তা দেখার বিষয়।

আমরা উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি যে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্র নিপীড়নমূলক আচরণ করছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব চূড়ান্ত বিচারে জনগণের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে নয় বরং পূর্ণরূপে সম্পৃক্ত করেই কেবল রাষ্ট্রের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। আর জনগণের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সুরক্ষা না করে তাদের সম্পৃক্ত করা সম্ভব নয়।

সুলতানা কামাল: নির্বাহী পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।