ভিক্ষা দেবেন কাকে?

Print Friendly, PDF & Email

ভিক্ষুক পুনর্বাসনের নানা স্লোগান ও সংগঠন থাকলেও দেশে দিন দিন ভিক্ষুক বাড়ছে। মানবিক ও সামাজিক বোধের কারণে মানুষ ভিক্ষুকদের দান খয়রাতও করছে বেশ। অনেকে চক্ষুলজ্জার কারণেও ভিক্ষুকদের এড়াতে পারেন না। কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তির মূলোৎপাটনে কেউ চিন্তা করেন না। যে কারণে দেশে ভিক্ষুক কমছে না।

ভিক্ষাবৃত্তিকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে যিনি কর্মক্ষম তার জন্য কোনোভাবেই ভিক্ষা করা উচিত নয়। ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সা. ভিক্ষাবৃত্তিকে অপছন্দ করতেন। কোনো ভিক্ষুক চোখে পড়লেই তাকে কাজের পথ দেখিয়ে দিতেন। একটি ঘটনা তো বেশ পরিচিত। এক লোক নবীজির কাছে এসে ভিক্ষা চেয়েছিল।

নবীজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে বিক্রি করার মতো কী আছে? লোকটি একটি কম্বল এনে বলল, এটা বিক্রি করা যায়। নবীজি সেটা বিক্রি করে কিছু টাকা দিয়ে খাবার খেতে বললেন, আর কিছু টাকা দিয়ে একটি কুড়াল কিনে দিলেন। বললেন, এবার বনে গিয়ে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করো।

এটি ছিল ভিক্ষুক নিরসনে নবীজির শেখানো চমৎকার পদ্ধতি। কিন্তু এ পদ্ধতি আজ কোথাও অনুসরণ করা হয় না। আমাদের সমাজে ভিক্ষাদাতার সংখ্যা অনেক। তারা মনে করেন নিজের উপার্জিত অংশ থেকে কিছু দান খয়রাত করা দরকার। কিন্তু এর জন্য উপকারী জায়গা অধিকাংশজনই খোঁজে দেখেন না। এই প্রবনতাই দিন দিন ভিক্ষুক বাড়িয়ে তুলছে দেশে। চারপাশ ভরে উঠছে ভিক্ষুকে। ভিক্ষা হয়ে উঠছে উপার্জনের সহজ পেশা। এভাবে একজনকে দেখে উৎসাহিত হচ্ছে অন্যজন। সেও আসছে ভিক্ষাবৃত্তিতে। তাই ক্ষেত্র বিশেষে এ কথা অনায়াসে বলা যায় যত্রতত্র ভিক্ষাদান সমাজের উপকার নয় অপকার করছে। ভিক্ষুক পেশায় উদ্বুদ্ধ করছে মানুষকে।

এভাবে যত্রতত্র ভিক্ষা দেয়ার ফলে ভিক্ষাবৃত্তি শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক থাকেনি, সিন্ডিকেট করে এক শ্রেণির লোক একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। যেখানে ভিক্ষা করাটাও একটা চাকরি। রীতিমতো এসব প্রতিষ্ঠানে লোক নেয়া হয়। সারাদিন ভিক্ষা করে যা উপার্জন হয় সেটা মালিককে দেয় ভিক্ষুকরা। এর বিনিময়ে থাকা ও তিনবেলা খাবার পায় প্রশিক্ষিত ভিক্ষুকরা।

ভিক্ষাবৃত্তিকে চরমভাবে ঘৃণা করে ইসলাম। ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সা. ভিক্ষাবৃত্তিকে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রুজিরোজগারের জন্য শ্রমের পরিবর্তে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উত্থিত হবে যে, তার চেহারায় এক টুকরো গোশতও থাকবে না। বুখারি

ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বলা যায়, যার কাছে একদিন একরাতের জীবিকাও আছে, তার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি সম্পূর্ণ হারাম। হাদিস শরিফের স্পষ্ট বাণী, শক্ত-সমর্থ ও দৈহিক সুস্থ-সবল ব্যক্তির জন্য ভিক্ষা করা হালাল নয়। তিরমিজি

আজকাল কৃত্রিম উপায়ে মানুষকে প্রতিবন্ধী বানিয়ে ভিক্ষা করে অনেক চক্র। যাদের অক্ষমতা দেখলে আমাদের হৃদয় কেঁপে উঠে। ভিক্ষা দিতে বাধ্য হই। ইসলাম এমন ধোঁকা ও শঠতাকে স্পষ্ট হারাম বলেছে। মহানবী সা. প্রবঞ্চনাকারীকে নিজের উম্মত নয় বলে ধমকি দিয়েছেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে যদি কোনো ব্যক্তি আয়ের সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বনের পরও অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের অত্যাবশ্যকীয় ন্যূনতম মৌলিক প্রয়োজন পূরণে সক্ষম না হয়, তবে বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরকারি উদ্যোগে ওই ব্যক্তির পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে সামাজের বিত্তবান, ধনাঢ্য লোকদের দায়িত্ব হলো ওই অক্ষম ব্যক্তির বেঁচে থাকার উপায় অবলম্বন করে দেওয়া। ভিক্ষা দেয়া নয়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কঠোর ব্যবস্থা এবং মানুষের দৃঢ়সংকল্পই ভিক্ষাবৃত্তির মতো সামাজিক অনাচার দূর করতে পারে।

এ জন্য ভিক্ষা দেয়ার আগে ক’মুহূর্ত চিন্তা করে নেয়া উচিত। দেখে নেয়া উচিত লোকটি আসলেই অক্ষম কিনা। ভিক্ষা নেয়ার উপযোগী কিনা। সেরকম হলে তাকে ভিক্ষা দেয়া যেতে পারে। এছাড়া কাজ করার মতো শক্তি সামর্থ আছে এমন লোককে আপনি পথ দেখিয়ে দিতে পারেন যেন তাকে আর ভিক্ষা করতে না হয়। অন্যথায় আপনার ভিক্ষা অপাত্রেই যাবে এবং এটি ভিক্ষাবৃত্তি বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করবে।