বড় বাধা উচ্চ সুদ : মাতলুব

Print Friendly, PDF & Email

ব্যাংক সুদের উচ্চ হার এ দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ। সম্প্রতি রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবি আর) মূসক (মূল্য সংযোজন কর) অনলাইন প্রকল্পের মূল দপ্তরে দেশের বিনিয়োগের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি।

ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, সুদের হার একক সংখ্যায় নামিয়ে না আনলে বিনিয়োগের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো কঠিন হবে। উদ্যোক্তারা অনেক কষ্ট করে অর্থ, শ্রম, মেধা ব্যয় করে বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়ে কারখানা গড়ে তোলেন। সেখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বেশির ভাগ কারখানা উৎপাদন শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই মুনাফায় যায় না। এর জন্য সময় লাগে। অথচ এ দেশের উদ্যোক্তাদের ব্যবসার শুরুতেই উচ্চ হারে সুদ দিতে হচ্ছে। সুদের

হারের বোঝা বড় মাপের উদ্যোক্তার জন্য বহন করা যত খানি কঠিন তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি কষ্টকর মাঝারি ও ছোট মাপের উদ্যোক্তার জন্য। সুদের হারের বোঝা বইতে না পেরে অনেকে বিনিয়োগ গুটিয়ে ফেলে। ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। সময়মতো সুদ পরিশোধ করতে না পারায় অনেকের ঋণ বকেয়া হয়ে যাচ্ছে।

সুদের হার কমানোর পাশাপাশি বকেয়া ঋণ পরিশোধেও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করতে হবে। দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা এ দেশের ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত পুঁজির চেয়ে বেশি। খেলাপি ঋণ বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। সহজ শর্তে এই ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে।

মাতলুব আহমাদ বলেন, ‘আমি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর সুদের হার কমাতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনায় বসেছি। এরই মধ্যে সুদের হার ১৮ শতাংশ থেকে ১১-১২ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি।

যতক্ষণ না সুদের হার একক সংখ্যায় নামছে ততক্ষণ চেষ্টা চালিয়ে যাব। আশা করছি, খুব অল্প সময়ে এ হার এক অংকে আসবে। সুদের হার এক অংকে পৌঁছালে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে আগ্রহী হবে। অতি দ্রুত বিনিয়োগ বাড়বে।’

বিনিয়োগের জন্য যুগোপযোগী নীতি কৌশল প্রণয়ন একটি জরুরি বিষয় এমন মত জানিয়ে সভাপতি বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো অনেক পুরনো আইন ব্যবহার হয়। এসব আইন-কানুন একটির সঙ্গে অন্যটি জড়ানো। বিশ্ব এখন অনেক এগিয়েছে। এসব পুরনো নীতি-কৌশল উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।

বহু বছরের এসব পুরনো নিয়ম-কানুন পরিবর্তন করা হলে বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আশার কথা হলো অনেক নীতি-কৌশল সংশোধন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরনো নীতি-কৌশল বাতিল করে নতুনভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে। তাই আশা করছি, অদূর ভবিষ্যতে এ সমস্যা থাকবে না।’

মাতলুব আহমাদ বলেন, বিনিয়োগ বোর্ড, শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন, এনবি আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরো নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিগত দিনের তুলনায় যোগাযোগ বেড়েছে। তবে আরো দ্রুত এ যোগাযোগ বাড়াতে হবে।  বিনিয়োগের জন্য

বিশ্বের সম্ভাবনাময় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এমন দাবি জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘এ দেশের  বিনিয়োগে অনেকে আগ্রহী। ছোটখাটো কিছু সমস্যা তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এফবিসিসিআই পর্যায়ক্রমে সংলাপে বসছে। এসব সংলাপে আমাদের সমস্যাগুলো সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।

সংলাপের এ সমস্যার সমাধান হয়েছে কি না বা এ কাজে কতটা অগ্রগতি হয়েছে পরবর্তী সংলাপে তা জানতে চাওয়া হচ্ছে। এতে সরকারের প্রতিনিধিরা আমাদের কাছে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এভাবে অনেকগুলো সমস্যার এরই মধ্যে সমাধান হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কমছে।’

গ্যাস-বিদ্যুৎ এ দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের সমস্যা নয় জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘একসময় গ্যাস-বিদ্যুৎ এ দেশের বিনিয়োগে বড় বাধা ছিল। কিন্তু বেশ কয়েক বছর থেকে এ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকার যথেষ্ট মনোযোগী হয়েছে। এ খাতে নতুন নতুন উদ্যোক্তা এসেছে। সরকার তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সব রকমের সহযোগিতা করছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জ্বালানি সংকট দূর হবে।

তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে গতি আরো বাড়াতে হবে। আমি এ বিষয়ে সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে তারা কথা দিয়েছেন, প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের চাহিদামাত্র বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পদক্ষেপ নেবেন।’

তবে সংকটের জন্য তিনি বিগত সরকারকে দায়ী করে বলেন, বিগত সরকারের নেওয়া নীতির কারণে বর্তমানে গ্যাসের সহজলভ্যতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার এফবিসিসিআইকে সঙ্গে নিয়ে এ সংকট অতি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এমন মত জানিয়ে মাতলুব আহমাদ বলেন, হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুর নাই। গত কয়েক বছরের তুলনায় এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। এ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। আরো কিছুদিন এমন পরিবেশ বজায় থাকলে উদ্যোক্তারা নিশ্চিত হতে পারবে। তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জমি সংকট একটি বড় সমস্যা। জমির দাম অনেক বেড়েছে। আবার যেখানে কারখানা করা প্রয়োজন সেখানে সুবিধামতো জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।

এ সমস্যার সমাধানে অর্থনৈতিক জোন নির্মাণ প্রয়োজন। সরকার ব্যবসায়ীদের এ সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে অর্থনৈতিক জোন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গতি আনতে হবে। এ কাজে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে মাতলুব আহমাদ বলেন, এ ভার শুধু সরকারের ওপর চাপিয়ে বসে থাকলে চলবে না। বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এসব খাতের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তিনি বলেন, যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। ফলে এসব দেশের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।

অর্থপাচার রোধে সরকারকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে বিনিয়োগ লাভজনক হলে অর্থপাচার বন্ধ হবে। এ জন্য রাজস্ব হার কমানোরও সুপারিশ করেন তিনি।

-কালের কন্ঠ