বৈরুতের জন্য দুই ফোঁটা

Print Friendly, PDF & Email

সারা পৃথিবীর আকাশে-বাতাসে চার দিন ধরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্যারিসের কান্না। হাজার হাজার মাইল দূরে এই বাংলাদেশে আজকের জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতেও অনেক জায়গা জুড়ে আছে প্যারিস।

আমাদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ পুরো জাতি ফ্রান্সের এই গভীর শোকে শামিল হয়েছেন। প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর চার দিন ধরে এ দেশের সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে ওই ঘটনা। গতকাল মঙ্গলবারের সংবাদপত্রগুলোতেও অনেক জায়গা জুড়ে ছিল প্যারিস, ফ্রান্স, ইউরোপ।
এতে কোনো ভুল নেই; শোক ও সমবেদনা প্রকাশে আমরা কখনো কার্পণ্য করি না।

কিন্তু ফ্রান্সের এবং বৃহত্তর অর্থে ইউরোপের মানুষের এই অতি মর্মান্তিক দুর্যোগের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে এবং তাদের সূত্রে আমাদের সংবাদমাধ্যমকেও এমনভাবে গ্রাস করেছে যে প্রায় একই সময়ে পৃথিবীর আরেকটি প্রান্তে ঘটে যাওয়া একই রকমের মর্মান্তিক ঘটনার খবর প্রায় অলক্ষে্য থেকে গেছে। বৈরুতের কান্নার ধ্বনি অন্ততপক্ষে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রতিধ্বনিত হয়নি বা হলেও অত্যন্ত ক্ষীণভাবে হয়েছে।

আমরা কজন জানি যে প্যারিসের গুলি ও বোমার শব্দে পৃথিবী প্রকম্পিত হওয়ার ২৭ ঘণ্টা আগে ভূমধ্যসাগরের ঠিক ওপারেরই ছোট্ট দেশ লেবাননের রাজধানী বৈরুতের একটি মহল্লায় পরপর দুই দফা বোমা বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে কয়েক ডজন মানুষের দেহ? হ্যাঁ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়

বৈরুতের বুর্জ আল-বারাজনেহ্ নামের এক মহল্লায় লোকজন যখন মাগরিবের নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসছিল, তখন মসজিদটার পাশেই জনাকীর্ণ রাস্তায় একটা বেকারির সামনে ঘটে প্রথম বোমা বিস্ফোরণ। তার কয়েক মিনিট পরেই প্রায় ৫০ মিটার দূরে বিস্ফোরিত হয় দ্বিতীয় বোমাটি। ১৪ বছরের এক কিশোরসহ প্রায় ৪০ জনের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। রাস্তায় পড়ে থাকে বিভিন্ন বয়সী মানুষের বিচ্ছিন্ন হাত, পা, মাথা, মুণ্ডুহীন ধড়, নাড়িভুঁড়ি, মাংসের স্তূপ। রক্তে ভিজে যায় রাস্তা ও ফুটপাত।

বৈরুতে সেই সন্ধ্যায় ওই দুটি আত্মঘাতী বোমা হামলায় মোট ৪৩ জনের মৃত্যু ও ২৩৯ জনের আহত হওয়ার মর্মান্তিক দুঃসংবাদ আমাদের জানানোর ফুরসত পায়নি এ দেশের সংবাদমাধ্যম। বৈরুত তো প্যারিস নয়, লেবানন তো ইউরোপ নয়, যে ইউরোপ আমাদের সাবেক প্রভু, আমাদের মনোজগৎ এখনো যার উপনিবেশ।

তবে এ কথাও সত্য যে খবরটি আমরা পেয়েছি ইউরোপ-আমেরিকার সংবাদমাধ্যম থেকেই। স্বল্প পরিসরে হলেও খবরটি তারা পরিবেশন করেছে। আমি ব্রিটেনের দৈনিক গার্ডিয়ান ও দ্য ইনডিপেনডেন্ট, আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমস ও রাশিয়ার ইজভেস্তিয়া পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থেকে

তথ্যগুলো সংগ্রহ করে এখানে তুলে ধরলাম। এসব পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, প্যারিসে হামলার মতো বৈরুতের ওই জোড়া বোমা হামলার দায়িত্বও স্বীকার করেছে ইসলামি জঙ্গিবাদী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ইন্টারনেটে দেওয়া বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, তারা বৈরুতের ওই মহল্লায়

হামলা চালিয়েছে শিয়া মুসলমানদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে। বৈরুতের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানতে পেরেছে, সেখানে আত্মঘাতী হামলাকারী আইএস যোদ্ধা ছিল তিনজন। তাদের দুজন ফিলিস্তিনি, একজন সিরীয়। হামলার জন্য তারা বুর্জ আল-বারাজনেহ্ মহল্লাটি বেছে নিয়েছিল এ জন্য যে

সেটা শিয়া-অধ্যুষিত এবং সেখানকার লোকজন হিজবুল্লাহর সমর্থক। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, লেবাননের হিজবুল্লাহ সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের সমর্থক, আর সুন্নি মুসলমানদের সংগঠন আইএস বাশার সরকারকে উৎখাত করে গোটা সিরিয়ায় খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

বৈরুতে নিহত হয়েছে ৪৩ জন, আর প্যারিসে ১৩২ জন। কিন্তু সংখ্যার বিচার প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়। নিউইয়র্ক টাইমস-এর সংবাদদাতা অ্যান বারানার্ড গত রোববার বৈরুত থেকে লিখেছেন, সেখানকার মানুষ প্যারিসে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে

মনোবেদনার কথাও জানিয়েছেন। কারণ, বৈরুতের শোক প্যারিসের শোকের মতো গুরুত্ব পায়নি। তাঁদের বিবেচনায়, প্যারিসের হত্যাযজ্ঞ আমেরিকার টুইন টাওয়ারের হত্যাযজ্ঞের মতো গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু বৈরুতের হত্যাযজ্ঞ যেন পৃথিবীর নজরেই পড়েনি। ‘বৈরুত, অলসো দ্য সাইট

অব ডেডলি অ্যাটাকস, ফিলস ফরগটেন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক টাইমস-এর বৈরুত প্রতিনিধি লিখেছেন, ফ্রান্সের জাতীয় পতাকায় উদ্ভাসিত করে তোলা হয়েছে স্মারকস্তম্ভগুলো; ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ সুরক্ষার তাগিদ উচ্চারিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের বক্তব্যে;

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সাবস্ক্রাইবারদের প্রোফাইল পিকচারে ফ্রান্সের তিনরঙা জাতীয় পতাকার প্রলেপ লাগানোর ‘ওয়ান-ক্লিক’ সার্ভিস চালু করেছে, কিন্তু লেবাননের জাতীয় পতাকার জন্য এমন সার্ভিস চালু করেনি। লেবাননের লোকজনের ফেসবুকে দেওয়া কিছু মন্তব্য-প্রতিক্রিয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।

যেমন, এলি ফারেস নামে এক চিকিৎসক লিখেছেন, ‘আমার স্বজনেরা যখন মারা গেল, তখন কোনো দেশ তাদের পতাকায় সেই চিহ্ন তুলে ধরার দরকার বোধ করল না। আমার স্বজনেরা যখন মারা গেল, তখন পৃথিবী তাদের জন্য শোক করল না। আন্তর্জাতিক সংবাদ পরিক্রমায় তাদের মৃত্যু তো

নিছকই অপ্রাসঙ্গিক টুকরো খবর, এমনই সাধারণ ঘটনা, যা পৃথিবীর ওই অংশে হরহামেশাই ঘটছে।’ লেবাননের অনেক মানুষ খেদের সুরে তাঁকে বলেছেন, ‘আরবদের জীবনের দাম তো সামান্য।’

বাংলাদেশের অনেক ফেসবুকার নিজ নিজ প্রোফাইল পিকচারে ফরাসি পতাকার স্বচ্ছ ছাপ লাগিয়ে সৌহার্দ্য প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ সচেতনভাবেই তা করেননি; তাঁদের মধ্যে এমন মানুষও আছেন, যাঁরা মনে করেন প্যারিসে যে হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে, সেটা ফ্রান্স তথা পাশ্চাত্য শাসক

শক্তিগুলোর ওপর মুসলমানদের তরফ থেকে আইএসের প্রতিশোধ। এই দৃষ্টিভঙ্গির সব মানুষ যে আইএসের ভাবাদর্শ ও যুদ্ধকৌশল সমর্থন করেন, তা হয়তো নয়। কিন্তু তাঁরা ইরাক-লিবিয়া-সিরিয়ায় যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর অশুভ ভূমিকার পাল্টা আঘাতের প্রত্যাশা করেন।

আইএসের হাত দিয়ে যদি তা ঘটে থাকে, তবে মন্দ কী? আবার এমন অনেকেও আছেন, যাঁরা মনে করেন, আরব বিশ্বে প্রতিনিয়ত যে হাজার হাজার মুসলমান নৃশংসভাবে মারা যাচ্ছে, তাদের জন্য তো পৃথিবী কাঁদছে না, তাহলে প্যারিসে এই কজন অমুসলমানের জন্য এত আহাজারি করার কী আছে?

তবে, সম্ভবত এই দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে নিরীহ সাধারণ মানুষের হত্যাযজ্ঞে এদের অধিকাংশ মানুষই শোকার্ত হয়। প্যারিসের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

তবে সারা পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমের আচরণে বিশুদ্ধ মানবিক সংবেদনশীলতার অভাব মাঝেমধ্যেই ফুটে ওঠে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সেটা হয়তো জাত্যভিমানপ্রসূত, লক্ষ্যাভিমুখী রাজনৈতিক কৌশল ও বাজার-চাহিদার প্রাসঙ্গিকতার হিসাবনিকাশ দ্বারা পরিচালিত হয়। আমাদের দেশে তা

হয়তো একটু অন্য রকমের; এখানে সাংবাদিকতায় পেশাদারত্বের ঘাটতির পাশাপাশি ঔপনিবেশিক মানসিকতার রেশও ক্রিয়াশীল বলে মনে হয়। এ দেশে একজন ইতালীয় বা একজন জাপানি নাগরিকের খুন হওয়ার খবর কেন এবং কীভাবে এদেশীয় মানুষের প্রাত্যহিক খুনখারাবির সমস্ত ঘটনাকে ম্লান করে দিতে পারে, তা বোঝা খুব কঠিন নয়।

প্যারিসের জন্য কান্নার শব্দে বৈরুতের কান্না শোনা যায়নি। দেরিতে হলেও আসুন, বৈরুতের জন্যও দুই ফোঁটা অশ্রু ফেলি।

মশিউল আলম: সাংবাদিক।