শুনতে পাচ্ছেন কি প্রিয় জাফর ইকবাল স্যার?

Print Friendly, PDF & Email

আমার কাছে সব সময়ের জন্যই ‘জাফর ইকবাল’ নামটা একটা প্রজাপতির। যে ডানা মেলে উড়ে যায়। রেখে যায় পাখনা। সে পাখনায় ভর করে উড়ার স্বপ্ন দেখে হাজারো তরুণ মুখ।

আদতে তিনি একজন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। যে ফেরিতে উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায় অদম্য তারুণ্য। সে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা গত ক’দিন আগে কিছু তরুণ মুখেরই বিচার চেয়ে রাস্তায় নামলেন, বৃষ্টিতে ভিজলেন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার সমর্থক একদল শিক্ষার্থী তাদের প্রতিপক্ষ শিক্ষকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে ও সেসব শিক্ষার্থীদের শাস্তি চেয়ে তাকে রাস্তায় নামতে দেখে আমরা কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। বাংলাদেশে এটা প্রথম কোনো শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা ছিল না।

আমাদের চোখের সামনে এখনো ভাসছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের ‘বিধ্বস্থ’ চেহারা। জাবির সে অধ্যাপকসহ এর আগে বিভিন্ন সময় শিক্ষকদের পেটানো হলেও আমাদের সম্মানিত জাফর স্যার ছিলেন নীরব। অতীতে তার এমন নির্লিপ্ত ভূমিকায় আমরা আশাহত হয়েছি।

যে নষ্ট শিক্ষক রাজনীতি আজ শিক্ষক-ছাত্রকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে স্যার সে বিষয়েও বরাবরই ছিলেন নীরব। তাকে কখনো বলতে শোনা যায় না ‘শিক্ষকেরা রাজনীতি ছেড়ে শ্রেণীকক্ষে ফিরে যাও’।

তাহলে ছাত্ররাও শ্রেণীক্ষের ভদ্র ছাত্রটি হতে বাধ্য হবে। দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও তিনি বরাবরের মতই ছিলেন নীরব। বারবার পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হওয়া ‘রক্তাক্ত ক্যাম্পাস’ তার হৃদয় গলাতে পারেনি।

যাইহোক, সেই অঘটনের ক’দিন পর এসে আমরা বিস্মিত না হয়ে পারছি না যখন দেখি, স্যার একই টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যাদের বিচার চেয়েছিলেন তাদের ‘বাচ্চা ছেলে’ মর্মে সাফাই গেয়ে দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করছেন।

তিনি বেমালুম তার আগের বক্তব্য অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন। তাকে এসব করতে দেখে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, মাঝের দু’দিনে কী এমন ঘটে গেল যে স্যার রাতারাতি তার অবস্থান পাল্টে ফেললেন?

এখানে কি আমরা স্যারকে যাত্রা দলের সেই সংয়ের ভূমিকায় পাচ্ছি, যে ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। এপার থেকে ঠেলা খেয়ে ওপারে যায়, ওপার থেকে ঠেলা খেয়ে এপারে আসে। যাত্রা দলের কাউকে নিয়ে আমাদের মাথা-ব্যথা নেই।

কিন্তু স্যারকে নিয়ে আছে। স্যারের মতো মানুষদের যে আমরা জাতির ‘মাথা’ মনে করি। তাই সে ‘মাথা’ কোনো দল বা গোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ হবে তা মানতে পারি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে এসে ছাত্রীর প্রেমে দিওয়ানা, ক্লাশ ছেড়ে ক্ষমতার চাটুকারি করা ইত্যাদি রঙের রঙিলা হিসেবে আমরা আমাদের শিক্ষকদের দেখতে চাই না। একটা নির্দিষ্ট রংয়ে চিনতে চাই আপনাদের স্যার। আশা করি জাফর স্যার আমাদের সামনে পরিষ্কার করবেন, অদূর ও দূর ভবিষ্যতে কোন রঙে আমরা তাকে চিনতে পারব?

প্রিয় জাফর ইকবাল স্যার শেষ করছি একটা আবেদন দিয়ে, আমাদের কিছু জাতীয় ‘মাথা’ দরকার। জাতীয় হৃদয় দরকার। জাতীয় বৃক্ষ দরকার। প্রতিটা জাতিরই তা রয়েছে।

পাশের দেশ ভারতে তাকান, এপিজে আবদুল কালামের মতো জাতীয় চরিত্র সেখানে উপস্থিত। যিনি সব ভারতীয়ের কাছে স্বজন ও সজ্জ্বন। সবশেষে তার মাথা একান্তই ভারতের সম্পদ। তিনি কেবল ভারতেরই গর্ব।

এসব মাথা সব কিছু ভুলে শুধু দেশের স্বার্থে কাজ করবে স্যার। হিমালয়ের মতো বিশাল সে হৃদয় সবাইকে ভালোবাসবে। যে মৌলবাদী বা বিপদগ্রস্থ, তাকে ভালোবাসবে আলোর পথে ফেরাতে।

যে আলোর পথের দিশারী তাকে ভালোবাসবে সে আলো দিয়ে আশপাশের অন্ধকার তাড়াতে। আমাদের একটা বৃক্ষ দরকার। ঝড় হলে যে আমাদের আশ্রয় দিবে। প্রচণ্ড রোদে যে আমাদের ছায়া দেবে। আমরা যার তলে বসে শান্তির পরশ পাব। চির সবুজ সে গাছ হবে আমাদের ঐক্যের প্রতীক।

অভাগার এ দেশে অনেক কিছুই আছে স্যার। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্যি আমাদের একজন এপিজে আবদুল কালাম নেই। একজন লতা মুঙ্গেশকর আমাদের সমাজে গড়া উঠেনি। এই দেশে যারা নিজেদের বিশাল বৃক্ষ, বিশাল মাথার, বিশাল হৃদয়ের অধিকারী বলে দাবি করেন তাদের আমরা রাষ্ট্রীয়

কৃপার আশায় ভাঁড়ের ভূমিকায় দেখে আশাহত হই স্যার। তাদের কাউকে রাজকবির ভূমিকায় দেখে আমাদের করুণা হয়। আমাদের লজ্জ্বায় মুখ ঢাকতে ইচ্ছে করে। খুব নীরবে অথচ সরব আওয়াজ নিয়ে দেশ জুড়ে উঠা একটা ছিঃ ! ছিঃ! হাহাকার আমি শুনতে পাই স্যার।

স্যার, আমরা কোনো গোপাল ভাঁড় চাই না। আমরা যাত্রা দলের সে একচোখা প্রধানের উপস্থিতি চাই না আমাদের হাজারো সমস্যা জর্জরিত জীবনে। আমরা একজন ব্যক্তিত্ববান এপিজে আবদুল কালাম চাই। একজন স্বপ্নের কারিগর চাই।

যার থেকে শুধু মুগ্ধতা ছড়ায়। যার সৌরভের কাছে পেছনের সব গন্ধ ঢাকা পড়ে যায়। যার প্রেরণায় মানুষ দ্বন্দ্ব ভুলে নতুন কিছু করার শক্তি পায়। আমরা সব মানুষের পারাপারের জন্য একটা ‘বন্ধন সেতু’ চাই স্যার।

তারুণ্যের এ আর্তনাদ আপনার হৃদয়ে আঁচর কাটবে কি স্যার!