বৈঠকে ব্যয় কোটি টাকা

Print Friendly, PDF & Email

কোটি টাকা ব্যয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে বৈঠক। দেয়া হয়েছে নানা পরামর্শ ও সুপারিশ। এসব বাস্তবায়ন হয়েছে কি-না তার খোঁজ রাখেননি কেউই। তবে বৈঠকে উপস্থিত এমপিদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সমাধান হয়েছে।

হাস্যকর অনেক সুপারিশ ও পরামর্শও দেয়া হয়েছে কমিটিগুলোর বৈঠক থেকে। বিশেষ করে কুকুরে কামড়ানোর অভিযোগের মতো বিষয়েও আলোচনা করে সুপারিশ করেছে কমিটি। সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, প্রতিটি বৈঠকের জন্য একজন এমপির পেছনে ২৫০০ টাকা ব্যয় হয়।

উপস্থিত ভাতা ও অবস্থান ভাতার নামে এ টাকা দেয়া হয়। বৈঠকের দিন উপস্থিত থাকার জন্য প্রত্যেক এমপিকে দেয়া হয় ১০০০ টাকা। আবার বৈঠকের আগে ও পরের দুইদিন অবস্থানের জন্য দেয়া হয় ৩৭৫ টাকা করে ১৫০০ টাকা।

এর বাইরেও বৈঠকের জন্য বিমান ভাড়া বাবদ ভাতা নিতে পারেন এমপিরা। বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য যারা বিমানযোগে ঢাকায় আসেন তারা প্রতিটি বৈঠকের জন্য ৩টি করে বিমানের টিকিট পান।

এর মধ্যে আসা-যাওয়া বাবদ ২টি টিকিট দেয়া হয় এমপির জন্য। অপর একটি টিকিট দেয়া হয় এমপির স্ত্রী বা নিকট আত্মীয়ের জন্য। গত ৮ মাসে প্রায় ৫০ জন এমপি বৈঠকের উদ্দেশ্যে বিমানের টিকিট নিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ৫০টি কমিটি ৫৭৭টি বৈঠক করে। এতে গড়ে ৭ জন করে এমপি অংশ নেন। এ হিসেবে বৈঠকে অংশ নেয়া এমপি’র সংখ্যা হয় ৪০৩৯ জন।

প্রত্যেককে ২৫ শ’ টাকা করে দেয়ায় শুধু বৈঠকের জন্য সরকারের খরচ হয়েছে ১ কোটি ৯৭ হাজার ৫শ’ টাকা। এর মধ্যে মূল কমিটির বৈঠকের সংখ্যা রয়েছে ৫১০টি। এর বাইরে ৩৬টি সাব-কমিটি বৈঠক করেছে ৬৭টি।

বৈঠককে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০ জন এমপি বিমানের টিকিট বাবদ নিয়েছেন প্রায় ৩০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকের জন্য গত ৮ মাসে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। সংসদের ৩৫০ জন এমপি ৫০টি সংসদীয় কমিটির সদস্য।

প্রতিটি কমিটিতে অন্তত ১০ জন করে সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে অনেক এমপি একাধিক কমিটির সদস্য হিসেবে আছেন। বিশেষ করে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত এমপিরা সর্বোচ্চ ৪টি থেকে ২টি কমিটির সদস্য পদে আছেন।

অপরদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিরা অন্তত একটি কমিটিতে সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বের অন্যান্য সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে কমিটির সুপারিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়।

সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে কমিটিগুলোকে নিয়মিত অবহিত করা হয়। আমাদের দেশে ওই রেওয়াজ নেই। কমিটি সুপারিশ বা পরামর্শ দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। মন্ত্রণালয় সুপারিশ বাস্তবায়ন করলো কি করলো না সেদিকে নজর দেন না।

সংসদীয় কমিটির এ দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে নেয় মন্ত্রণালয়গুলো। এমনকি কমিটির ডাকে সাড়া দিতে কেউ বাধ্য নয়।  এসব প্রসঙ্গে সংসদের কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান  বলেন, জনগণের টাকায় এমপিরা যেসব কাজ করেন তা জনবান্ধব হওয়া উচিত।

আসলে হচ্ছে উল্টোটা। কমিটির সুপারিশ যে বাস্তবায়ন হয় না তা নিয়ে টিআইবি একাধিকবার তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে। এমনকি আমাদের পক্ষ থেকেও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সংসদীয় কমিটির কাছে মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতার বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করা নেই। গত ৮ মাসে কমিটির বৈঠক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈঠক করেছে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।

কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রতি মাসে অন্তত একটি বৈঠকের বিধান থাকলেও এ কমিটি ৩১টি বৈঠক শেষ করেছে। এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর।

এর পরেই ১৬টি করে বৈঠক করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়বিষয়ক স্থায়ী কমিটি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

এছাড়া, ১৫টি বৈঠক করেছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি। পরিকল্পনা ও মহিলা এবং শিশুবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি করেছে ১৪টি বৈঠক। এসব বৈঠক থেকে বেশির ভাগ সময় এমপিরা বিদেশ সফরের ব্যবস্থা করার জন্য সুপারিশ করেন।

আবার কোন কোন কমিটি ঢাকায় এমপিদের জন্য একাধিকবার প্লট দেয়ার পরামর্শ দেয়। এর আগে প্লট নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এমপিদের চাপাচাপিতে বিরক্ত প্রকাশ করেন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রাজউকের বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্পে ৩৩৬ জন এমপিকে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া, কমিটির বৈঠকগুলোতে বিদেশ সফর নিয়ে একাধিকবার সুপারিশ ও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কয়েক দফা সুপারিশ করেছে ভিয়েতনাম, চীন ও ভারত সফরে যেতে। ২১শে এপ্রিল  বৈঠকে ওই তিন দেশ সফরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

পরে তা অনুরোধ আকারে পাঠানো হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। ২৪শে জুন কমিটির পরবর্তী বৈঠকে মন্ত্রণালয় ওই সিদ্ধান্তের অগ্রগতির কথা জানায়। এ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন এইচএন আশিকুর রহমান।

সর্বশেষ গতকাল বুধবার ১০ম বৈঠকেও একই বিষয় নিয়ে সুপারিশ করে কমিটি। এমনকি কুকুরে কামড়ানোর অভিযোগ নিয়েও সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।

গত ৫ই মে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটি তাদের বৈঠকে দেশের সরকারি কোয়ার্টারগুলোতে সব ধরনের গরু, ছাগল ও কুকুর রাখা যাবে না বলে সুপারিশ করে। সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তার স্ত্রীকে বেরসিক কুকুর কামড় দেয়ার পর লিখিতভাবে কমিটিতে অভিযোগ করা হয়।