অষ্টম বেতন-কাঠামো, বেতন-বৈষম্য ও শিক্ষকদের মর্যাদা

Print Friendly, PDF & Email

আমি নিজে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাই, অষ্টম বেতন কাঠামো, এর কথিত বেতন-বৈষম্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে গেলে আমার পক্ষে মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন।

তাছাড়া, যে বিষয়ের আমি নিজেও একজন অংশীজন (স্টেকহুল্ডার) বলেই, এ-নিয়ে এর আগে কোথাও লিখিনি।

এ কথাও অনস্বীকার্য যে, যেহেতু আমিও এ ‘বিষয় ও বিতর্কে’র অংশ, সেহেতু এ-বিষয়ে লিখতে গেলে সাবজেকটিভ হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

তাছাড়া, ‘সাবজেকটিভ’ হয়েও ‘অবজেকটিভ’ হওয়ার সাফাই গাওয়া এবং বস্তুনিষ্ঠতার দাবি করা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা বলে মনে করি। তাই, পাঠকের কাছে আমার এ প্রারম্ভিক-কৈফিয়ত।

ফলে, এ নিবন্ধে আমি যে পুরোপুরি অবজেকটিভ এটা দাবি করছি না; কেননা প্রস্তাবিত অষ্টম বেতন কাঠামোর ভেতর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের প্রতি যে অন্যয় করা হয়েছে, এ-পরিবারের সদস্য এবং মুরুব্বিদেরকে (সিলেকশান গ্রেড প্রফেসর)

যে অসম্মান করা হয়েছে, এ পরিবারের সদস্য হিসেবে তার প্রতিবাদ করাও আমার তরফে নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্বের অংশ বলে মনে করি। তাই, এ নিবন্ধটি আমার ‘পেশাসত্তা’ এবং ‘লেখকসত্তা’র যৌথ ভাবনা-চিন্তা ও দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে রচিত।

ফরাস উদ্দিন বেতন কমিশনের রিপোর্ট এবং সচিব কমিটির সুপারিশ নিয়ে প্রস্তাবিত ‘অষ্টম বেতন কাঠামো’ সম্পর্কে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

এটি যেন সরকারের নজরে আসে সে জন্য দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে ‘শিক্ষক সমিতি’গুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন’এর ব্যানারে

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে কয়েক মাস ধরে বেশ কিছু প্রতীকী প্রতিবাদমূলক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট না-করে; প্রশাসনিক, একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্থ করে এমন কোনো কর্মসূচি না-দিয়ে সকল

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সরকারের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।

এর বাইরেও বিভিন্ন সংবাদপত্রের নিবন্ধ লিখে, সংবাদমাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে, মানববন্ধন করে, কালো ব্যাজ ধারণ করে, প্রতিবাদ সমাবেশ করে, বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর টকশোতে অংশ নিয়ে শিক্ষকরা তাঁদের দাবি, অসন্তোষ, অপমান ও

আত্মমর্যাদার কথা নানানভাবে প্রকাশ করে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের সমস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শিক্ষকদের আত্মমর্যাদায় আঘাত পাওয়ার বিষয়টি অবহিত করে শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া মৌখিক ও লিখিতভাবে পেশ করেছেন।

এরই মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার স্বপক্ষে সরকারকে অনুরোধ করে অফিসিয়ালি একটি সরকারি পত্র বা ‘ডিও লেটার’ও প্রদান করেছেন। পার্লামেন্টেও এ-নিয়ে সামান্য আলোচনা হয়েছে। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের দৃষ্টি কোনোভাবেই আকর্ষিত হচ্ছে না।

অথবা সরকার দেখেও ঠিক দেখছে না কিংবা কোনো এক অদৃশ্য কারণে সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি এ-বিষয়ে কোনো ধরনেরই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন না। যার ভেতর দিয়ে প্রতিভাত হয় যে, সরকার বিষয়টিতে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না কিংবা সরকারকে এ-বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া থেকে বিরত রাখা হচ্ছে।

যার অর্থ দাঁড়ায় ফরাসউদ্দিন বেতন কমিশন যে প্রস্তাবনা দিয়েছেন এবং সচিব কমিটি সে প্রস্তাবনার উপর ‘সুপারগ্রেড’ তৈরি করে যে মতামত দিয়েছেন, সরকার তার খুব একটা পরিবর্তন না-করেই প্রস্তাবিত অষ্টম বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।

একদিকে ফেডারেশন প্রস্তাবিত বেতন-কাঠামো সংশোধন ও পরিবর্তন না-হলে ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যদি অশান্ত হয়ে যায়, তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দায়ী থাকবে না বলে এক ধরনের সংকেত দিয়ে রেখেছে।

অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী শুরু থেকেই শক্তভাবে বলছেন, ‘টাইম স্কেল এবং সিলেকশান গ্রেড থাকছে না’, যদিও তিনি অতিসম্প্রতি বলেছেন, ‘টাইম স্কেল ও সিলেকশান গ্রেড আমি ভালো বুঝি না, তবে এটা নিয়ে ভেবে দেখতে হবে।’ সব মিলিয়ে একটা অস্বস্তিকর পরস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এ রকম একটি পরিস্থিতিতে, অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ-বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে।

প্রস্তাবিত অষ্টম বেতন কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, শিক্ষকদের অবস্থানের কীভাবে অবনমন হচ্ছে এবং কীভাবে অবনমন করে তাদের পদায়ন করে নিচে নামানো হচ্ছে তা নিয়ে কিছু ধুম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে।

সরকারের দুয়েকজন দায়িত্বশীল সচিব বেশ কয়েকবার সংবাদপত্রে মন্তব্য করেছেন, ‘শিক্ষকরা বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। না-বুঝে আন্দোলন করছেন।’

এ-ধরনের বক্তব্য বেশ আপত্তিজনক; কেননা উচ্চশিক্ষিত এবং বাইরে প্রশক্ষিত জনসম্পদের একটা বিরাট অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। অথচ উনারা ‘প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো’ বুঝেন না, আর কয়েকজন সচিবই সবজান্তা শমসের!

এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষমতার দাম্ভিকতাই প্রতিভাত করে। তাছাড়া, মিডিয়াতে নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখালেখির ফলে পুরো বিষয় নিয়েই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। আমি অত্যন্ত সহজ করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি।

প্রস্তাবিত অষ্টম বেতন-কাঠামোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবস্থান সপ্তম বেতন কাঠামোর বিবেচনায় দুধাপ (সিলেকশান গ্রেড বাদ দিলে তিন ধাপ) নিচে পদায়ন করা হয়েছে।

এ-নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক

প্রফেসর মইনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর মো: জাকির হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব প্রফেসর এ এস এম মাকসুদ কামাল নিবন্ধ লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কীভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে তার সবিস্তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

এসব নিবন্ধে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের করুণ ও লজ্জাকর বেতন-কাঠামোর তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করে শিক্ষকদেরকে এদেশে কীভাবে অবমূল্যায়ন ও অমর্যাদা করা হয়, সে বিষয়াদির বিষদ ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে তাদের দাবি-দাওয়ার ন্যায্যতা প্রমাণ করা হয়েছে।

তাছাড়া, একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের মাধ্যমে সুন্দর, সমৃদ্ধশালী ও উন্নত দেশ গঠনের জন্য শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষকের গুরুত্ব নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

তথাপি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি ও আন্দোলন নিয়ে বাজারে একটি অত্যন্ত ভুল ধারণা জারি আছে। এখানে মূল আর্গুমেন্ট ‘বেতন কম, তাই সম্মান কম’ নয়; বরঞ্চ শিক্ষকদের পদ ও মর্যাদার প্রশ্নটিই এখানে অধিক গুরুত্ব¡পূর্ণ।

কেননা, সপ্তম বেতন কাঠামোর মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবস্থানক্রম একই জায়গায় রেখে, সিলেকশান গ্রেড বাদ না-দিয়ে এবং অন্যান্য গ্রেডের সঙ্গে সমন্বয় করে একই আনুপাতিক হারে বেতন বৃদ্ধি করলে আমার মনে হয় না যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন হত। যেমনটা আগেও কখনও হয়নি।

সরকার প্রতি পাঁচ বছর পর পর যেভাবে ‘পে-স্কেল’ প্রদানের মাধ্যমে বেতন বাড়িয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সে বেতনই বিনাবাক্যে মেনে নিয়েছে। আমি নিজে তিন/চারটি ‘পে-স্কেলে’ বেতন পেয়েছি। অনেকের মধ্যে কিছু ‘ব্যর্থ হা-হুতাশ’ ছাড়া

কোনোদিন কাউকে উচ্চবাচ্য করতে দেখিনি। মাঝে মাঝেই শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেলের দাবি উঠেছে, কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত শক্ত কোনো ‘সুর’ হয়ে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত আন্দোলন হয়ে বেজে ওঠেনি।

বাজারমূল্য ও নিজেদের যোগ্যতার বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন এবং অন্যান্য সুবিধা তুলনামূলক অনেক কম হলেও তারা ‘অব্যক্ত বেদনা’ ও ‘অনুত্তেজিত ক্ষোভ’ নিয়ে সব মেনে নিয়েছেন। সুতরাং ‘বেতন কম’ বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের

শিক্ষকদের সম্মান এতটুকুও কমেনি। অন্তত আমি সেটা মনে করি না। কিন্তু প্রস্তাবিত ‘অষ্টম বেতন কাঠামো’য় যেটা করা হয়েছে, সেটা হচ্ছে ‘গ্রেড-১’ এর আগে আরও দুটি গ্রেডহীন গ্রেড বসানো হয়েছে: মুখ্য সচিব/মন্ত্রিপরিষদ সচিব (যাদের বেতন সুপারিশ

করা হয়েছে ৯০,০০০ টাকা), আর সিনিয়র সচিব (যাদের বেতন ৮৪,০০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে)। তারপর ‘গ্রেড-১’ এ আবার দুটি ক্যাটেগরি: পদায়িত সচিব (যাদের বেতন ৭৮,০০০ টাকা) এবং অপদায়িত বা ওএসডি সচিব (যাদের বেতন ৭৫,০০০ টাকা)।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদেরকে সিলেকশান-গ্রেড তুলে দিয়ে ওএসডি সচিবের কাতারে (গ্রেড-১ এর ৭৫,০০০ টাকা হিসেবে) ফেলে বেতন-ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ-প্রক্রিয়ায় পদায়ন করে অন্যান্য অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক এবং প্রভাষকদের বেতনধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে, যেটা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কারও পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

সপ্তম বেতন-কাঠামোয় সিনিয়র সচিব (যদিও তখন ‘সিনিয়র সচিব’ বলে কিছু ছিল না যা সচিবরা নিজেরাই পরে তৈরি করে নিয়েছেন) আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেকশান-গ্রেড প্রফেসররা একই স্কেলে বেতন পেতেন।

তাহলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র প্রফেসররা কী এমন পাপ করেছেন আর সচিবালয়ের সচিবরা কী এমন পূণ্য করেছেন যে, চরম বৈষম্য দিয়ে স্কেল নির্ধারণ করতে হবে?

তাই, এখানে অর্থের ব্যাপারটি একেবারেই মূখ্য নয়। মূখ্য হচ্ছে পদায়ন, অসম্মান, অমর্যাদা এবং আত্মমর্যাদায় আঘাত। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আপনি আমাকে বেতন কম দেন, কিন্তু আমাকে অসম্মান করার অধিকার নেই। ঠিক আছে যদি যুক্তির

খাতিরে ধরে নিই যে, সম্মান আর অসম্মান করার অধিকারও আপনার আছে, কিন্তু অপমান করার অধিকার আপনার নিশ্চয়ই নেই। এটাই শিক্ষকদের আন্দোলনের মূল দাবি।

স্কেলের যেহেতু একটা প্রতীকী এবং কাঠামোগত মূল্য আছে, তাই স্কেল পুননির্ধারণের দাবি এর সঙ্গে অটোমেটিক্যালি সংযুক্ত হয়ে যায়।

সে কারণেই সিনিয়র অধ্যাপকদের সিলেকশান গ্রেড ফিরিয়ে দিয়ে সিনিয়র সচিবের সমান করে অন্যান্য ধাপে (অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক এবং প্রভাষকদেরকে) একইভাবে সমন্বয় করে প্রস্তাবিত বেতন-কাঠামো সংশোধন ও

পুননির্ধারণেনের যে দাবি– শিক্ষক পরিচয়ের বাইরেও দেশের একজন নাগরিক হিসেবে শিক্ষকদের সে দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক ও ন্যায্য বলে মনে করি।

আরও বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করছি। একটা টকশোতে দেখলাম সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন না-করে নিজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বেতনবৃদ্ধির পরামর্শ দিচ্ছেন। ফরাস উদ্দিন বেতন

কমিশনের প্রতিবেদনেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বাবলম্বী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সচিব কমিটি নিজেদের সুপার গ্রেডসহ অন্যান্য সুপারিশ করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বাবলম্বী’ হওয়াল সুপারিশ বহাল রেখেছেন।

আমি একে অশুভ সংকেত হিসেবে দেখতে চাই। কেননা, শিক্ষার্থীদের উপর বেতনের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাবলম্বী হওয়ার পরামর্শ মূলত শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তরের কর্পোরেট এজেন্ডা ছাড়া কিছুই নয়।

মাননীয় মন্ত্রীর কথা শুনে মনে হল, বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রাইভেট করে ফেললেই বেতনের ঝামেলা চুকে যায়!

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান ধনী-দরিদ্র বৈষম্য ‘সুযোগ ও অধিকার’-এর জায়গায় আরও পাকাপোক্ত হয়ে যাক যাতে কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, শ্রমজীবী মানুষ, আদিবাসী, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিচতলার মানুষের ছেলেমেয়েরা আর পড়াশুনা করতে না-পারে।

কেননা বিদ্যা অর্জনের যোগ্যতা থাকলেও বিদ্যা কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। তাই, উঁচুতলার মানুষরাই ‘বিদ্যা’ কিনবে। আর ‘ছোটলোক’ ‘ছোটলোক’ হয়ে থাকবে ‘বড়লোকের’ দুনিয়ায়! তখন, শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘পাবলিক’ বলে কিছুই আর থাকবে না, সবই ‘প্রাইভেট’ হয়ে যাবে!

এটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কতটা ভয়ংকর পরিণতি নিয়ে আসবে, সেটা উপলব্ধি করবার মতো বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, দেশপ্রেমিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব বর্তমান সরকারের মধ্যে যথেষ্ট আছে বলেই মনে করি।

শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মাধ্যমে দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যত সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা কারা করছে, সে বিষয়ে সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

পরিশেষে বলতে চাই, এটা এখনও ‘প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো’; ফলে কিছুই চূড়ান্ত নয়। তাই, সংশোধনের সুযোগ রয়ে গেছে। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই যে, অন্যায়ভাবে সাজানো, চরমভাবে বৈষম্যপূর্ণ, অমর্যাদাকর বেতন-কাঠামোটি সরকার কোনোভাবেই চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে পারে না।

দেশের ৩৭ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষক, লাথো শিক্ষার্থী, তাদের লাখ লাখ অভিভাবক এবং হাজারও কর্মচারীর এক বিরাট ‘বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে’র সকলের পক্ষ থেকে এ ‘বিশ্বাসে বিশ্বাস’ রাখতে চাই যে, সরকার

‘অষ্টম বেতন-কাঠামো’ সংশোধন করে শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের সকল শিক্ষক সমাজকে যথাযর্থ মর্যাদা প্রদান করবেন।