কত লোকের শার্টের বোতাম লাগাবেন মন্ত্রী!

Print Friendly, PDF & Email

মন্ত্রী হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নানা তৎপরতা আমাদের মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ে। রাস্তাঘাট, সড়ক-মহাসড়ক ও সেতুর তদারকি এবং এসব দিয়ে যানবাহন যাতে ঠিকঠাক চলতে পারে, তা নিশ্চিত করা তাঁর বড় দায়িত্ব।

সন্দেহ নেই আমাদের মতো দেশে কাজটি কঠিন। আইন ভাঙতে আর আইন না মানাতেই যেন আমাদের বেশি আনন্দ।

তিনি এ জন্য নিয়মিতই এখানে-ওখানে যান, সড়ক-মহাসড়কে গাড়ি থামান, মন্ত্রণালয়ের লোকজন বা পুলিশ নিয়ে সেখানে হাঁটাহাঁটিও করেন।

আমরা নাগরিকেরা একটু স্বস্তি পাই, দেশের সড়ক-মহাসড়কে পরিস্থিতি যা-ই হোক, তিনি অন্তত ‘চেষ্টা’ করে যাচ্ছেন!

আমাদের মন্ত্রীদের মধ্যে অনেকেই ‘ডিজিটাল’ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয়। ওবায়দুল কাদেরও সেই তালিকায় রয়েছেন।

ফেসবুকে তিনি বেশ সক্রিয়। ১ লাখ ৪৩ হাজারের ওপর ফলোয়ার আছেন তাঁর। সেখানে নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃতি আমার শিক্ষক।

মানবতা আমার বই। জীবন আমার স্কুল।’ (ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা)। নিয়মিত ছবি ও ছবির অ্যালবাম আপলোডও করেন তিনি।

৮ আগস্ট তিনি যে অ্যালবামটি আপলোড করেছিলেন, তার নাম ‘রোড সেফটি প্রোগ্রাম মাওয়া ০৯-০৮-২০১৫’। ‘সড়ক নিরাপত্তায়’ তাঁর কর্মতৎপরতার কিছু ছবি আছে ওই অ্যালবামে।

একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক ব্যক্তি কান ধরা অবস্থায় রয়েছেন এবং এক পুলিশ সদস্য সেই ব্যক্তিকে ওঠবস করানোর কাজটি করছেন।

আর পাশে দাঁড়িয়ে তা দেখছেন ওবায়দুল কাদের। সেই ছবিটি এখন অবশ্য তাঁর ফেসবুক পাতা থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এর আগেই তা ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে এবং সেই সঙ্গে সমালোচনাও।

আরও একটি ছবিও পাওয়া যায় ফেসবুকে, যেখানে ওবায়দুল কাদের হাত উঁচু করে রেখেছেন এক মোটরসাইকেল আরোহীর সামনে, আর সেই আরোহী তাঁর শার্টের বোতাম লাগাচ্ছেন। এই দুটি ছবির যে

‘খবর’ ফেসবুকে পাওয়া যায়, তা হচ্ছে সড়ক-মহাসড়ক পরিদর্শনের সময় নিয়ম ভাঙায় সিএনজিচালিত এক অটোরিকশাচালককে কান ধরে ওঠবস করানো ও শার্টের বোতাম খোলা থাকায় মোটরসাইকেল আরোহীকে বোতাম লাগাতে বাধ্য করেন মন্ত্রী।

দেশের কয়েকটি পত্রিকাতে এ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে ‘চালককে কানে ধরিয়ে সমালোচনায় কাদের’ শিরোনামে। (১০.০৮.২০১৫)

ছবি দুটি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা মানবেন যে ছবির সঙ্গে ‘খবর’ দুটির মিল রয়েছে। মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতা কি তাহলে নিজেই আইন কার্যকরের কাজে নেমে পড়লেন!

অটোরিকশাচালক নাহয় আইন ভেঙেছেন, কিন্তু শার্টের বোতাম খোলা রাখা কি আইন ভাঙা? আর আইন ভাঙলেই কি অটোরিকশাচালককে এই শাস্তি দেওয়া যায়? একজন নাগরিককে শারীরিক বা অপমানকর শাস্তি দেওয়ার এই বিধান কোথায় আছে?

আমাদের দেশে সবকিছুতেই এখন সংবিধানের দোহাই রয়েছে। সংবিধান রক্ষা করতে হবে বলেই তো ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করা জরুরি ছিল।

আইন, আইনের প্রয়োগ, আমাদের নাগরিক অধিকার—এসব নিয়ে কী বলে আমাদের সংবিধান। ‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং

সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইন অনুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না যাহাতে কোন

ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’ (তৃতীয় ভাগ, মৌলিক অধিকার, অনুচ্ছেদ ৩১, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার)

দুটি ছবিরই যে ‘খবর’ আমাদের কাছে প্রকাশ পেয়েছে, তা সংবিধানের লঙ্ঘন। কারণ, এতে শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়া ও মান-মর্যাদায় আঘাত দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।

আরও অবাক লাগে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী হঠাৎ লোকজনের শার্টের বোতাম লাগানো নিয়ে পড়লেন কেন! বাংলাদেশের কত লোকের শার্টের বোতাম লাগবেন মন্ত্রী? নাকি এটা শুধু মোটরসাইকেলওয়ালাদের জন্য!

বাংলাদেশে জনগণকে আইন মানানো সত্যিই কঠিন কাজ। নিষিদ্ধ করার পর মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে চালক নিশ্চয়ই আইন ভেঙেছেন।

সেই আইন ভাঙার জন্য শাস্তিও তাঁর পাওনা। কিন্তু আত্মমর্যাদা এমনই এক জিনিস, যা সব মানুষেরই আছে, সেখানে অটোরিকশাচালককে আলাদা করে দেখা যায় না। তাঁকে প্রকাশ্যে শারীরিক শাস্তি দেওয়া বা তাঁর কান ধরা ছবি ফেসবুকে দেওয়া যায় না।

অটোরিকশাচালক আইন ভেঙেছেন, কিন্তু যে মন্ত্রীরা, সাংসদেরা, সরকারের সচিব-যুগ্ম সচিবেরা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বা এমনকি গণমাধ্যমের লোকজন নিয়মিত উল্টো পথে গাড়ি চালান, সেটাও তো আইন ভাঙা, তাঁদের জন্য কী বিধান, মাননীয় মন্ত্রী?

আমাদের দেশে সরকারগুলোয় যাঁরা থাকেন, তাঁরা অনেক সময়ই সমালোচনাকে পাত্তা দেন না। নিস্পৃহ থেকে একই কাজ করে যেতে থাকেন।

নিজের ভুল, অসংযত বা দায়িত্বহীন বক্তব্য অথবা কাজকেও সঠিক বলেই গোঁ ধরে থাকেন। ছবি নিয়ে নানা সমালোচনার পর ওবায়দুল কাদের অন্তত বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়েছেন এবং তা স্বস্তির বিষয়।

তিনি তাঁর ফেসবুক থেকে ছবি উঠিয়ে নিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার ফেসবুকে একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। ‘কেউ যদি পুলিশ দেখে ভয়ে নিজেই নিজের কান ধরে তাহলে মন্ত্রী কী করতে পারে—আমি তাকে শুধু বলেছি তুমি কেন কান ধরছ—তোমাকে কেউ কান ধরতে বলেনি। আশা করি এখানেই ভুল–বোঝাবুঝির অবসান হবে।’

ওবায়দুল কাদেরের ‘স্কুল’ হচ্ছে ‘জীবন’। জীবন থেকে আমাদের সবারই নিশ্চয়ই শেখা উচিত। তিনি ফেসবুকে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বা অটোরিকশাচালকের কাছ থেকে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেছেন, তা থেকে আমরা এটা অন্তত শিখলাম যে অটোরিকশাচালক বা এ ধরনের লোকেরা আইনকে কতটা ভয় পান।

সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, একদিন ঢাকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোন গাড়িগুলো বা কাদের গাড়ি উল্টো পথে চলছে, তা দেখুন আর গাড়িগুলোকে থামান।

আমরা নিশ্চিত, তাঁদের কেউই আপনার সঙ্গের পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে অটোরিকশাচালকের মতো আচরণ করবেন না।

কেউ সে ধরনের আচরণ করুক, তা আমরা চাইও না। আপনি শুধু সেই গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত ট্রাফিক আইনে মামলা করার ব্যবস্থা করুন।

ওবায়দুল কাদেরের ‘ভুল–বোঝাবুঝির অবসানের’ ব্যাখ্যায় অবশ্য শার্টের বোতাম লাগানোর বিষয়টি নেই। তাঁকে অনুরোধ করি, সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মতো কঠিন দায়িত্ব পালনের বাইরে আর কোনো

বাড়তি দায়িত্ব নেওয়ার দরকার নেই। আর দেশের এত সমস্যার ভিড়ে শার্টের বোতাম লাগানো আপাতত বড় কোনো সমস্যা নয় বলেই তো মনে হয়! কিছু লোক নাহয় শার্টের দু–একটি বোতাম খোলা রেখেই চলাফেরা করল! পাঠক কী বলেন?