কবরেও স্বাভাবিক মৃতদেহ রাখার গ্যারান্টি নেই!

Print Friendly, PDF & Email

কবর থেকে লাশ চুরি করে সেই লাশ সিদ্ধ দিয়ে মাংস ছাড়িয়ে বের করে নেয়া হয় কঙ্কাল। আর সেই কঙ্কাল বিক্রি করা হচ্ছে মেডিকেল কলেজগুলোতে কিংবা হাঁড় পাচারকারীদের কাছে।

অনেকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার কবরস্থান থেকে লাশ চুরি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নীরবতা আমাদেরকে বিস্মিত করেছে।

উদাহরণত উল্লেখ করতে হয়, চারদিকে ঘন গজারি বন। গভীর রাত, ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঝি-ঝি পোকা আর শেয়ালের ডাকে এক ভয়ার্ত পরিবেশ।

গা ছমছম করা ওই পরিবেশে গাজীপুরের ধীরাশ্রম এলাকার গজারিয়া চালা কবরস্থান থেকে লাশ চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে আবেদ আলী ও তার ছেলে শাহজাহান।

একটি অথবা দু’টি নয় ১৩টি লাশ কবর থেকে তুলেছিলেন তারা। কোনোটি অর্ধগলিত আবার কোনোটি একেবারেই কঙ্কাল।

কবরস্থানের পাশে একটি পরিত্যক্ত ঘরে গরম পানিতে লাশগুলোর পচা মাংস ছাড়ানোর সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন তারা।

চলতি বছরের ২৬ জুলাইয়ের ঘটনা এটি। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করে তাদের আদালতে হাজির করে। তবে বেশিদিন তাদের জেলহাজতে থাকতে হয়নি। কারাগার থেকে বের হয়ে আবারও তারা ফিরে গেছেন পুরনো পেশায়।

লাশ চুরি চক্রের সদস্য আবদুল মোতালেব জানান, গত কয়েক বছরে গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ এলাকার বিভিন্ন কবরস্থান থেকে তারা কয়েক হাজার লাশ চুরি করেছেন।

এরপর সেগুলোর কঙ্কাল বিক্রি করে দিয়েছেন। একেকটি কঙ্কাল তারা মহাজনের কাছে বিক্রি করেছেন পাঁচ হাজার টাকায়।

জানা গেছে, কয়েক হাত ঘুরে যখন মেডিকেল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে এ কঙ্কাল পৌঁছে তখন এর দাম দাঁড়ায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।

প্রতি বছর দেশে কঙ্কালের চাহিদা রয়েছে আড়াই থেকে তিন হাজার। দেশে কঙ্কালের ব্যবসা অবৈধ হলেও ব্যাপক চাহিদার কারণে কবর থেকে লাশ চুরি করে তৈরি করা হচ্ছে কঙ্কাল।

বোনস বা কঙ্কাল ছাড়া একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর কোনভাবেই অধ্যয়ন করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যারা প্রথম এবং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাদের জন্য কঙ্কাল অত্যাবশ্যক।

কঙ্কাল ছাড়া এ শিক্ষাগ্রহণ একেবারেই অসম্ভব। অথচ কঙ্কাল সংগ্রহে সরকারি কোনো নীতিমালা নেই। ব্রিটিশ আমল থেকে অজ্ঞাত লাশ দিয়ে কঙ্কাল তৈরি করা হচ্ছে।

দেশের ২২টি সরকারি ও ৫৫টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে প্রতিবছর ভর্তি হয় প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে শতকরা ৬০ জন আগের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কঙ্কাল সংগ্রহ করে।

বাকি ৪০ ভাগ অর্থাৎ আড়াই হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর নতুন কঙ্কাল কেনে। সে হিসাবে প্রতি বছর দেশে কঙ্কালের চাহিদা আড়াই থেকে তিন হাজার।

জানা গেছে, কঙ্কালের ব্যবসা অবৈধ হলেও ব্যাপক চাহিদার কারণে এটি এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তবে এ ব্যবসা প্রকাশ্যে হয় না।

মেডিকেল যন্ত্রাংশ বিক্রির বিভিন্ন বড় বড়প্রতিষ্ঠানে চাহিদার কথা জানিয়ে অগ্রিম টাকা দিলেই মেলে কঙ্কাল। বিশেষ করে পুরনো ঢাকার মিটফোর্ড, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

এ ছাড়াও শাহবাগের বড় বড় ফার্মেসিতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় মেলে একেকটি কঙ্কাল। তবে রাজধানীতে অপেক্ষাকৃত কম দামে কঙ্কাল বিক্রি করে কয়েকটি চক্র।

এর আগে ভারত থেকে চোরাইপথে আসা কঙ্কাল বেশির ভাগ চাহিদা পূরণ করতো। বর্তমানে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করায় কঙ্কাল আসার সংখ্যা শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে।

তবে বেওয়ারিশ লাশ অথবা মৃত্যুর আগে কেউ তার দেহ দান করলে তার লাশ দিয়ে কঙ্কাল তৈরি করার নিয়ম দেশে প্রচলিত রয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে শুধু বেওয়ারিশ লাশ অথবা মৃত্যুর আগে কেউ তার দেহ দান করে গেলে ওই লাশ থেকে কঙ্কাল তৈরি করা হয়।

তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের কেউ কঙ্কাল তৈরি করে না। বাইরে থেকে লোক এনে কঙ্কাল তৈরি করা হয়। প্রতিটি কঙ্কাল তৈরি করতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়।

হাসপাতালের মর্গে কঙ্কাল তৈরি হয় না। ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার ফুটন্ত পানিতে লাশ ডুবিয়ে রাখা হলে শরীরের মাংস ও চর্বি আস্তে আস্তে আলাদা হয়ে যায়। এরপর ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করে পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

প্রসঙ্গত যে, কঙ্কাল চুরির ঘটনা প্রতিভাত করে মানুষই মানুষের খাদক। প্রশ্ন উঠে মানুষ কখন মানুষের খাদকে পরিণত হয়? মূলত দু’অবস্থায় এমনটি হয়।

এক. রাষ্ট্রযন্ত্র যখন তার নাগরিকদের মাঝে আদর্শগত চেতনা বা প্রবণতা তৈরিতে ব্যর্থ হয় অথবা এ প্রক্রিয়া শূন্য থাকে।

দুই. রাষ্ট্রযন্ত্র বৈষম্য তৈরি করে খালি পুঁজিপতিদের জন্য অবাধ পুঁজির দরজা খোলা রাখে। আর সাধারণ নাগরিকদের জন্য জীবন-জীবিকার পথ খুবই সঙ্কীর্ণ ও সীমাবদ্ধ করে রাখে।

বলাবাহুল্য, রাষ্ট্রযন্ত্র এ দুটো ক্ষেত্রেই গভীরভাবে দুষ্ট। কথিত কঙ্কাল চুরির ঘটনা তারই একটি অনুষঙ্গ বা প্রমাণ। অবস্থা এমন যে মানুষ মরেও শান্তি পাচ্ছে না।

বা মরার পরও মানুষের লাশটুকু পর্যন্ত নিরাপত্তায় থাকছে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতার উপজাত হচ্ছে যে কবরেও চোর-ডাকাত হামলা দিচ্ছে।

আগে শোনা যেত যে, মৃত ব্যক্তির কাফন চুরি হয়। এখন দেখা যাচ্ছে, খোদ মৃত ব্যক্তিই চুরি হয়ে যাচ্ছে। একি জঘন্য মানসিকতার দেশে বসবাস আমাদের?

সরকার এ লজ্জা ঢাকবে কি দিয়ে? সরকার যে শুধু স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দিতে পারছে না বিষয়টি তাই নয় বরং সরকার কবরের ভেতরও স্বাভাবিক মৃত দেহ রাখার গ্যারান্টি দিতে পারছে না।

আমরা সরকারের এই চরম নপুংসকতার জন্য গভীর নিন্দা জানাই। সরকার অন্তত মানুষের মৃতদেহ সংরক্ষণে সফল হোক- এই কামনা আকূলভাবে করি।