১২ শতাংশ নারী ভোটার হাওয়া!

Print Friendly, PDF & Email

ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণে নারী-পুরুষ ভোটারের পার্থক্য ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রাথমিক তথ্য উদ্বেগজনক।

এর মানে হলো, দেশে নতুন ভোটারদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারী ভোটারের হার বেশি পরিমাণে কমে গেছে। কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের উচিত হবে এ বিষয়ে পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা দেওয়া।

কারণ, ২০০৮ সালের সব থেকে নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকা, যাতে নারী ভোটাররা পুরুষ ভোটারের চেয়ে পৌনে ২ শতাংশ বেশি ছিলেন, তাঁরা গত সাত বছরে কেন পিছিয়ে পড়বেন।

চাকরির সন্ধানে বিদেশবিভুঁইয়ে ছোটেন পুরুষেরা, তাহলে নারী ভোটার কেন এত কমবেন? তাঁরা কর্পূরের মতো উবে গেছেন?
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নামে একটি সংগঠন এ বিষয়ে সঠিক ও সংগত প্রশ্ন তুলেছে। তবে সে কারণে আপাতত তাকেই সত্যি ধরে নেওয়ারও যুক্তি নেই।

সুজন ২০০৮ সালের সঙ্গে তুলনা করেছে। কিন্তু অনেকে তো ১৯৫০ সাল থেকে ৬৫ বছর ধরে প্রায় মীমাংসিত নারী-পুরুষের জনসংখ্যাগত অনুপাতের দিকেও নজর দেবেন, আর তখন তঁাদের চোখ ছানাবড়া হতে পারে।

কারণ, ১৯৫০ সাল থেকেই দেখা যাচ্ছে যে নারী-পুরুষের অনুপাতের তফাত কখনোই ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়নি। ১৯৫০ সালে ১০০ নারীর বিপরীতে ১০৬ পুরুষ ছিলেন। তার মানে নারীর চেয়ে পুরুষেরা শতকরা

৬ ভাগ বেশি ছিলেন। এরপর থেকে প্রতি ১০০ নারীর বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা ক্রমাগত কমেছে। ভোটার তালিকাতেও তার ছাপ পড়েছে। ১৯৭৯ থেকে ২০০১ পর্যন্ত প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে পুরুষের সঙ্গে নারী

ভোটারের ব্যবধান ৬.৪৪ থেকে ১.৪২ এর মধ্যে ওঠানামা করেছে। ২০০৮ সালে নারী ভোটাররা যখন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরুষ ভোটারকে ছাড়িয়ে যান, তখন সেটা হয়তো এর ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।

তবে আমরা তর্কের খাতিরে মানব যে ১২ শতাংশের ব্যবধান একেবারেই হতে পারে না, তা নয়। তবে প্রশ্ন তুলেছে বলে সুজনকে ক্ষমতাসীন দলের অনেকের মতো দ্রুত শত্রু ঠাহর করা লজ্জার বিষয়। সুজনকে

ক্ষমতাসীন সরকারের চোখে দেখা ঠিক নয় কোনো সাংবিধানিক সংস্থার।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এক কর্মকর্তাকে টেলিফোনে বললাম, সুজন তো একটি বিয়োগ অঙ্ক করেছে,

তাকে আপনারা ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলছেন কী করে? আপনারাই বলেছেন, নভেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত নতুন ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে ৪৬ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫০। এর মধ্যে নারী ভোটার হলো ২০ লাখ ৬৬ হাজার ১৪৪ এবং

পুরুষ ভোটার ২৬ লাখ ২৯ হাজার ৫০৬। অর্থাৎ নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটার থেকে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬২ জন কম এবং জেন্ডার গ্যাপ (পুরুষের তুলনায় নারীর পিছিয়ে পড়ার ব্যবধান) -১২ শতাংশ।

জেলাভিত্তিক নতুন ভোটারের তথ্য প্রকাশ করতে হবে এখনই। কারণ, ৬৪টি জেলার মধ্যে ২৮টি জেলায় জেন্ডার গ্যাপ ১০ শতাংশের ওপরে। অর্থাৎ ২০১৪-১৫ সালে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নতুন ভোটারদের

মধ্যে ৫৫ জন পুরুষের বিপরীতে ৪৫ জন নারী। আর নতুন ভোটারদের মধ্যে ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার ও ভোলায় পুরুষ ভোটারের চেয়ে নারীদের পিছিয়ে পড়ার হার ৩৫ শতাংশ

থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। সুজন বলেছে, বাড়ি বাড়ি না যাওয়ার কারণে এটা ঘটেছে—একেই সত্য বলে মনে করার কারণ নেই, আবার একে নাকচ করাও চলে না। ইসিকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। সুজনেরও অপেক্ষা করা

উচিত ছিল। কারণ, তারা এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পেয়ে চূড়ান্ত বিশ্লেষণের আগেই ইসিকে দায়িত্ব পালনে ‘অসমর্থ’ বলেছে।

২০০৯ সালের আইনের ১১ ধারায় প্রতিবছর জানুয়ারিতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কথা থাকলেও ইসি তা মানছে না। এটা পালন করা দরকার, না পারলে বিধি বদলে নিতে হবে। ইসি বলেছে, ‘স্পষ্টত ২০০৮

সালে অনেক পুরুষ ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।’ সে কারণে নারী ভোটারের সংখ্যা এতটা কমবে কেন? এই যুক্তি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এত দিন দেয়নি কেন?

এই প্রশ্ন আমরা ২০১৮ সালে গিয়ে যাচাই-বাছাই করলে ঝুঁকি বাড়বে বৈ কমবে না। আমার তো মনে হয়, ভোটার তালিকার হালনাগাদকরণে যে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েছে, এরপর আর এই কমিশনকে অবিকল ধরে

রাখা ঠিক হবে না। ২০১৯ সালে দলীয় সরকারের অধীনে একটি মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করতে হলে তার প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে। বিএনপিকে সবুর করার নীতি প্রকাশ করতে হবে। অধ্যাপক

এমাজউদ্দীন আহমদ আমাকে বলেছিলেন, তাঁরা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচনী ফর্মুলা দেবেন। এরপর মাসের পর মাস বয়ে যাচ্ছে। বিএনপিই যদি নির্বাচনী সংলাপের মূল বিষয় প্রকাশ করতে এত দেরি করে, তাহলে

সরকার তার সুযোগ নেবেই। এ কথা কারও স্থূলবুদ্ধির বিচারে বিএনপিকে ঘুম ভাঙানি গান শোনানো মনে হতে পারে। কিন্তু তা নয়। রাষ্ট্র বাঁচলে দল বাঁচবে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে পরপর দুটি প্রহসনের নির্বাচন

করলে শাসক দলের কতিপয় নেতার ভালো ঘুম হবে, কিন্তু তা নাগরিকের ভালো ঘুমের কারণ হবে কি না। আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে, আরও একটি মেয়াদে অর্থাৎ যেনতেন নির্বাচন করে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত

ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাওয়ার চাপ রাষ্ট্র বইতে পারবে কি না। এটা বিপজ্জনক যে ক্ষমতাসীনেরা যদি ভাবতে বসেন যে আগামী নির্বাচনে বিএনপি তার অস্তিত্বের স্বার্থে আসবে, কোনো অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ নির্বাচন তার নিজের স্বার্থে দরকার নেই।

আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে একটি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকার হালনাগাদ করার কাজ সম্পন্ন করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু হালনাগাদ করতে গিয়ে ইসি ইতিমধ্যে বেশ শৈথিল্যের পরিচয়

দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার কাজে তাদের আগ্রহ কম থাকার খবর ইত্তেফাক ও যুগান্তরসহ বিভিন্ন পত্রিকায় বের হয়েছে। ১৬ বছর বয়সীদের তথ্য সংগ্রহ ভালো

উদ্যোগ কিন্তু ইসি বলেছে, তাহলে ২০১৮ সালে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করতে গিয়ে আর বাড়ি বাড়ি যেতে হবে না, এটা একেবারেই বিপজ্জনক পরিকল্পনা মনে হয়। কারণ, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, ঠিকানা বদলানো,

ভোটারের বিদেশ গমন, মৃত্যুসহ বহু কারণ আছে, সেসব বিষয়ক তথ্য বাড়ি বাড়ি না গেলে পূরণ হবে না। আরও কিছুকাল আমাদের এই ধারা বজায় রাখতে হবে, কারণ প্রযুক্তিনির্ভর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, যেখানে যেটুকু ঘটেছে, তার ভিত্তি এখনো দুর্বল।

এক-এগারোর দুর্ভাগ্যজনক উপাখ্যান ঘটিয়ে এবং সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তদারকিতে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমরা ছবি-সংবলিত ভোটার তালিকা পেয়েছি। এটা একটা বিরাট জাতীয় অর্জন, এটা যেন হাতছাড়া

না হয়। সামনে অনেক চড়াই-উতরাই। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন দেওয়ার পেছনে কেবল বিচারপতি কে এম হাসান-সংক্রান্ত জটিলতা

নয়, বিচারপতি এম এ আজিজের করা বিতর্কিত ভোটার তালিকাও একটা বাস্তবসম্মত বড় বাধা সৃষ্টি করেছিল। বর্তমান নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অনেক কর্মকর্তা এখনো আছেন, যাঁরা দেখেছেন যে বহু

বছর পার করেও ইসি ফটো আইডি করতে পারেনি। সুতরাং এখন সুষ্ঠু ভোটার তালিকার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারলে তার থেকে আফসোসের বেশি কিছু হবে না।

কাজী রকিবউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন যা করার করে ফেলেছে, আমাদের কিন্তু এই উদাহরণ নেই যে একটি নির্বাচন কমিশন একাদিক্রমে দুটি সাধারণ নির্বাচন করেছে। সুতরাং রকিবউদ্দীন

কমিশনের এটাই বরং ধরে নেওয়া ভালো যে তারা আরও একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার সুযোগ পাবে না। আর একটি বছর বাদেই নতুন নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। বিএনপি তার অস্তিত্ব বাঁচাতেই

আসবে, নির্বাচন যেমনই হোক, তাতে কেবল বিএনপিরই আসবে–যাবে, আর কারও কিছুই হতে পারে না বা হবে না, সেটাও তো বলা যায় না। কারণ, ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং তাদের পছন্দ-অপছন্দ বলে একটা কথা এখনো চালু আছে।

তাই বিএনপির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ‘বিচলিত’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সামনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হাতছাড়া না করতে বলেছেন বটে, কিন্তু তাঁরাই বলেন, ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন নয়,

সেই নির্বাচন নিয়ে এখন এত নির্দিষ্ট করে বলার মানে যদি আগাম নির্বাচন হতো, তাহলে নাহয় একটা কথা ছিল। তবে এটা ঠিক যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মানলে নির্বাচন কমিশনকে একটি গ্রহণযোগ্য ভোটার

তালিকা হাতে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ, সংসদ নেত্রী যেকোনো সময় সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দিতে পারেন। সেখানে এখন ১২ শতাংশ পার্থক্যের যে খবর এসেছে, তা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। বিশেষ করে

এই বিষয়ে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে বলে সুজনের সঙ্গে যে আচরণ ইসি করেছে, তা খুবই অস্বাভাবিক। এটা নিন্দনীয় যে জেন্ডার গ্যাপ নিয়ে মতপ্রকাশের সূত্র ধরে এই সাংবিধানিক সংস্থাটি ভ্রান্ত

পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। সুজন তাদের কাছে তথ্য চাওয়ার পর ইসি কবে কোন ‘সরকারি কর্তৃপক্ষের’ কাছে নিবন্ধিত হয়েছে, তা জানতে চেয়েছে।

ইসির এই অন্যায্য লাল চিঠি এখনই প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত। ভোটার তালিকা হালনাগাদ-সংক্রান্ত সব তথ্য অবিলম্বে প্রকাশের দাবি জানাই।