জীবন ও অপমৃত্যু

Print Friendly, PDF & Email

মৃত্যু অবধারিত না হলে জীবনকে মানুষ এত ভালোবাসত না। স্বর্গ বা বেহেশতের অনন্ত সুখ-শান্তির কথা শুনেও মানুষ মরতে চায় না; রোগজরা, দুঃখ-দুর্দশা মেনে নিয়েও বেঁচে থাকতে চায়। যেকোনো মৃত্যুই বেদনার ও শোকের।

তবে সে মৃত্যু মানুষ মেনে নিতে বাধ্য। কিন্তু আকস্মিক অস্বাভাবিক মৃত্যু বা অপমৃত্যু, যে মৃত্যুর জন্য মানুষের প্রস্তুতি নেই, যা মর্মান্তিক অথচ সতর্ক হলে এড়ানো সম্ভব, তা মানুষকে অন্য রকম কষ্ট দেয়। তা শোক নয়—কষ্ট। স্বাভাবিক মৃত্যুর শোক আর অপমৃত্যুর কষ্ট দুই জিনিস।

তামাম দুনিয়ার মুসলমানদের স্বঘোষিত খলিফা আবু-বকর আল বোগদাদির ইসলামিক স্টেট মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে রক্তবন্যা বইয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন। তালেবানি উন্মত্ততা থেকে মসজিদের মুসল্লিরা পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছেন না। তাদের হিংস্রতায় নারী-শিশুর বাছবিচার নেই। দেশে দেশে গাড়িবোমায়

ছিন্নভিন্ন হচ্ছে শত শত মানবদেহ। সেসব খবর মানুষ পড়ে বা শোনে, আবার পরমুহূর্তেই ভুলে যায়। কারণ, ওসব সংঘবদ্ধ দস্যুতার প্রতিকার আমাদের জানা নেই। অথচ ছোট দু-একটি দুর্ঘটনা মানুষের অন্তরে গিয়ে বেঁধে।

আমি আমার জীবনে চারটি দুর্ঘটনার কথা ভুলতে পারিনি বহু বছরেও। দুটি ঘটনার আমি প্রত্যক্ষদর্শী, দুটি ঘটনার কথা কাগজে পড়েছি। আমি আমার জানালার পাশে পড়ার টেবিলে বসে লিখছিলাম। কী এক রকম জোরে শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখি ইটবোঝাই একটি ট্রাক ১২-১৩ বছরের একটি বালকের

পেটের ওপর দিয়ে চলে গেল। ছেলেটির নাড়িভুঁড়ি রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রইল। বস্তুত বালকটির দেহ তখন দুটুকরো। একদিকে বুক থেকে মাথার অংশ, অন্যদিকে কোমর থেকে পায়ের দিক।

দ্বিতীয় ঘটনাটির অকুস্থল মাওলানা ভাসানী রোডে টেনিস স্টেডিয়ামের উল্টো দিকে। আমি প্রেসক্লাব থেকে জাদুঘরে রিকশায় যাচ্ছিলাম। বাসের হাতলে ঝুলে থাকা একটি যুবক রাস্তায় পড়ে যায়। তার মুখের ওপর দিয়ে আর একটি দ্রুতগামী বাসের চাকা চলে যায়।

প্যান্ট-শার্ট পরা (সম্ভবত সুদর্শন) যুবকটির চেহারাবিহীন মৃতদেহ পড়ে রইল সড়কে। রিকশা থামিয়ে পুলিশ ডাকলাম। রাস্তার লোকজন যুবকটির দেহ টেনে এক পাশে এনে রাখল। হতভাগ্যের বাবা-মা ভাই-বোন কেউ জানল না তাদের প্রিয়জনের করুণ পরিণতির কথা।

একবার কলকাতার বারাকপুরে গঙ্গার তীরে গান্ধী মিউজিয়ামে দিন তিনেক ছিলাম তার সচিব সুপ্রিয় মুন্সীর আতিথেয়তায়। লাইব্রেরিতে বসে ছিলাম। কয়েকজন এসে বললেন, পুরো হাতটিই চলে গেল। কার হাত গেল, কীভাবে গেল জানতে চাইলাম। তাঁরা বললেন, কলকাতার শ্যামবাজার মোড়ের

কাছে বাসের এক যাত্রী বাইরে হাত রেখে বসে ছিলেন। অন্য একটি বাস দ্রুত যাওয়ার সময় তার হাতটি কাঁধ থেকে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। ঘটনাটির কথা কাগজেও এসেছিল। কল্পনায় লোকটির অবস্থা অনুভব করলাম।

পঞ্চাশের দশকে দেখেছি ঢাকার টাউন-সার্ভিস বাসের ভেতরে লেখা থাকত: ‘বাইরে হাত রাখিবেন না’। টাঙ্গাইল থেকে বাসে ঢাকা আসার পথে চন্দ্রার কাছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা তাঁর একটি হাত খোয়ান। দুটি বাস পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে যাচ্ছিল। একটি বাস ওই যাত্রীর একখানা হাত

ছিঁড়ে রাস্তার মধ্যে ফেলে রেখে যায়। পরে ওই যাত্রীর সঙ্গে কথা হয় আমার ও আলোকচিত্রী শিল্পী নওয়াজেশ আহমদের। ভদ্রলোক জানালেন, মানসিক জোরে তিনি শুধু বেঁচে ছিলেন। চন্দ্রা থেকে পঙ্গু হাসপাতাল পর্যন্ত আসতে তিনি জ্ঞান হারাননি।

ওই দুর্ঘটনার জন্য প্রতিযোগী দুই বাসের কোনটি দায়ী, নাকি যাত্রী দায়ী, সে প্রশ্ন পরে। সত্য হলো ঘটনাটি ঘটেছে। কোনো নির্জন মুহূর্তে আর একটি ঘটনার খবর আমাকে হানা দেয় এবং আমি প্রায় শিউরে উঠি।

সেটা বেশ কয়েক বছর আগের কথা। উত্তরবঙ্গের এক মহাসড়কের ঘটনা। কোনো এক অবুঝ যাত্রী বাসের জানালায় মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। উল্টো দিক থেকে আসা আর একটি বাস ওই বাসের গা ঘেঁষে তার গন্তব্যে চলে যায়।

তবে যাওয়ার আগে ওই যাত্রীর মাথাটি ঘাড় থেকে ছিঁড়ে নিয়ে যায়। দুর্ঘটনার সংবাদের যে অংশটি আমাকে বিস্মিত করে তা হলো দুটি বাসের কোনোটিই ঘটনার পর থামেনি। আরও দ্রুতগতিতে চলে যায়।

যাত্রীর মাথাটি দীর্ঘ সময় রাস্তায় পড়ে ছিল। যাত্রীর মাথাবিহীন শরীরটি নিয়ে যে বাসটি চলে যায়, সেই বাসের অনেক যাত্রী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মাথা ছাড়া মানুষ দেখে কেউ সুস্থ থাকতে পারে না।

স্নেহ-মমতা-বাৎসল্য ইতর প্রাণীর মধ্যেও দেখা যায়। প্রিয়জন বা আত্মীয়স্বজন হোক বা না হোক, যেকোনো মানুষ যখন কারও করুণ পরিণতি দেখে তখন তার মধ্যে মুহূর্তের জন্য হলেও করুণার উদ্রেক হয়।

সড়কে যানবাহন দুর্ঘটনায় যখন কেউ মারা যায় বা মারাত্মকভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে, তখন যে কাউকে তা কষ্ট দেয়, পরমুহূর্তে ভুলে গেলেও। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের কথা শুনে মানুষ বিশেষ বিচলিত হয় না। গা সহা হয়ে গেছে।

আমাদের পত্রপত্রিকা, রেডিও ও টিভি চ্যানেল সড়ক দুর্ঘটনার কথা খুবই গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। এ ক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা প্রশংসনীয়। এবার ঈদের আগে-পরের ১০ দিনে আড়াই শর মতো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন শত শত।

একটি কথা উল্লেখ করা দরকার, ঘটনাস্থলে অথবা হাসপাতালে নেওয়ার পথে যাঁরা মারা যান, শুধু তাঁদের সংখ্যাটাই গণনা করা হয়। দুই-চার-দশ দিন ভুগে যাঁরা মারা যান, তাঁরা থাকেন গণনার বাইরে।

নির্ভুল পরিসংখ্যান পাওয়া সম্ভব নয়, তবে বিষয়টি যাঁরা মনিটর করেন, তাঁদের ধারণা বছরে বাংলাদেশে অন্তত ১০ হাজার এবং ঊর্ধ্বে ১৮ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার অত্যন্ত শোচনীয় পরিস্থিতিতে ছাত্র-শিক্ষক-যুব-জনতার ব্যানারে ২০১১ সালে ঈদুল ফিতরের দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক বিরাট সমাবেশ করা হয়। মহাসড়কের বেহাল দশা ও সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে আগে কখনো আর অত বড় সমাবেশ হয়নি।

বহু টিভি চ্যানেল অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে। পত্রপত্রিকা বন্ধ ছিল। সাড়ে চার ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানে যে ৩০-৩২ জন বক্তব্য দেন তাঁদের দু–তিনজন বাদে সবাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার অথবা আওয়ামী লীগের অবিচল সমর্থক।

এবং তাঁরা সমাজে নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশিষ্ট। সরকারের নেতারা আয়োজকদের প্রতি সভা-সমাবেশে ও সংসদ অধিবেশনে খুবই বিরক্তি প্রকাশ করলেও, সড়ক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বিশেষ দৃষ্টিও দেন।

ফলে গত চার বছরে যোগাযোগব্যবস্থায় যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে, তবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও অনেক দেরি। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনা যে থেমে নেই, তা গত ঈদের সময় মৃতের সংখ্যা থেকে বোঝা যায়। কলেরা, প্লেগ বা বার্ড ফ্লুতে যদি ১০ দিনে আড়াই শ নয়, জনা দশেক মারা যেত, দেশে হইচই পড়ে যেত।

একালে যেকোনো বিষয় নিয়ে এনজিও খাড়া করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। কোনো বিষয়ে সাংগঠনিকভাবে কাজ করতে গেলে লোকবল দরকার এবং অর্থ দরকার। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কিছু কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও কাজ করছে।

একাডেমিক পর্যায়ে দুর্ঘটনার কারণ প্রভৃতি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা তিন-চার বছর ধরে তাঁদের মতো
করে কাজ করছেন। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি আশাব্যঞ্জক নয়।

শুধু সরকার বা এনজিও নয়, সচেতন নাগরিকদেরও একটা কর্তব্য রয়েছে। অতি ক্ষুদ্র সামর্থ্য থেকেও প্রত্যেকের উচিত মানুষের কল্যাণে কিছু করা। সাধারণ মানুষের মধ্যেও অনেকে চান মানুষের পাশে দাঁড়াতে। তবে উপায় ও সংগতির অভাব। শুধু গবেষণা ও আলোচনা করে সড়ক দুর্ঘটনার দুর্যোগ

প্রতিরোধ করা যাবে না। এ ধারণা আমার গত চার বছরে হয়েছে। একটি জাতির মনমানসিকতা গড়ে ওঠে শত শত বছর ধরে। এবং মনমানসিকতা ও স্বভাবচরিত্রের পরিবর্তনও ঘটে শত শত বছরে অতি ধীরগতিতে। তবে সব সমাজেই সংবেদনশীল মানুষ থাকেন এবং তাঁরা বিপদে অন্যের পাশে

দাঁড়াতে চান। কোনো জাতির জীবনে যখন সততার অভাব দেখা দেয়, তখন তারা যা খুশি তাই করে। জমিতে নলকূপ থেকে পানি দিতে আমদানি করা হচ্ছে শ্যালো ও টিউব অয়েল ইঞ্জিন, তা দিয়ে বানানো হচ্ছে ট্রাক, টেম্পো প্রভৃতি। সেগুলোর বাঙালি যে নাম দিয়েছে তাতেই তার রুচির পরিচয়:

নছিমন-করিমন-ভটভটি। মহাসড়কে এদের কারণেও বহু দুর্ঘটনা ঘটছে।
বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা না গেলেও কমানো সম্ভব। তার প্রমাণ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। সেখানে ১৭টি বাঁক সোজা করার

দাবি ছিল আমাদের। সরকার তা করেছে। সেখানে দুর্ঘটনা এখনো ঘটছে, তবে পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় কমে এসেছে অর্ধেকের বেশি।
নাগরিক হিসেবে আমরা সরকারকে চাপ দিলে কিছু কাজ হয়। বড় বড় বা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে আমরা যাই। ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেক সময়

তা কঠিন, কারণ ব্যয়সাপেক্ষ। আমার ২৪ বছরের পুরোনো গাড়ি নিয়ে দূরে কোথাও যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। দু-একবার বিকল হয়ে বিপদে পড়েছি। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় গাড়ি চাইলে খুব অসুবিধা না থাকলে তাঁরা দেন। কখনো গাড়ির জ্বালানিও তাঁরা দেন। প্রথম আলো থেকেও গাড়ি চেয়ে

নিয়ে আমি কয়েক জায়গায় গেছি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনের ছেলেমেয়েদের, কোথাও প্রথম আলোর বন্ধুসভার ছেলেমেয়েদের সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এগিয়ে আসতে দেখেছি। দুর্ঘটনায় যে মারা যায়, তার জীবন ফেরত পাওয়া যাবে না, কিন্তু আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সেবা দিলে তারা

স্বাভাবিক জীবন পেতে পারে। ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-কুমিল্লা রুটে এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে কয়েক শ ছাত্রছাত্রী। মানুষের কল্যাণে তাদের সম্পৃক্ত করা এবং মহাসড়কের পাশে ট্রমা সেন্টার করার বিষয়ে সরকারকেই ভাবতে হবে। কোনো কোনো এনজিও ও সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের নীতিতে সহায়তা করতে পারে।

অপমৃত্যু বা অপঘাতে মৃত্যুর অভিশাপ থেকে মানুষ হয়তো কোনো দিনই মুক্তি পাবে না। গত কয়েক মাসে সাপের কামড়ে মারা গেছে ১৭-১৮ জন। ৪০ জনের বেশি ছেলেমেয়ে মারা গেছে পানিতে ডুবে। গত এক বছরে বজ্রাঘাতে মারা গেছে পৌনে দুই শর মতো। গত দেড় বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ

হারিয়েছে শ দেড়েক। লঞ্চ ও ট্রলারডুবিতে দেড় বছরে মারা গেছে পাঁচ শতাধিক। রেললাইনে হাঁটতে হাঁটতে মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে জনা পনেরো।

কিছু অপমৃত্যু অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু অর্ধেকের বেশি রোধ করা সম্ভব। তার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন নাগরিকদের সতর্কতা। জীবন বড়ই মূল্যবান।