ফেসবুক: লাভ কী ক্ষতি কী

Print Friendly, PDF & Email

সব ভাল ভাল না। আমাদের চোখে যা দেখতে ভাল বা আমাদের কাছে খেতে যা ভাল লাগে তার সব কিছুকেই ভাল বলা যায় না। আবার ভাল কিছুও ভাল থাকে না যদি তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সবাই জানেন, অতিরিক্ত কোন কিছুই ভাল নয়।

সীমা ছাড়া কোন কিছুই ভাল হয় না। আর আল্লাহ্‌ সুবহানাহু তা’য়ালাও পবিত্র  কোরআনে অনেকবারই বলেছেন, তোমরা সীমা লঙ্ঘন করো না। অনেক ক্ষেত্রে, ভাল জিনিস ভাল থাকে না অপপ্রয়োগের কারণে।

ছুরি-চাকু-আগ্নেয়াস্ত্র যা-ই বলুন না কেন, কোনটাই মানুষের ক্ষতির জন্য তৈরি করা হয়নি। সবই মানুষের উপকারের জন্য তৈরি। কিন্তু এর অপব্যবহারের কারণেই বর্তমানে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এজন্য আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত এবং সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ।

গত এক শতাব্দী ধরে মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা। ক্রমে তা কল্পনার জগৎকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একের পর এক আবিষ্কার হচ্ছে নানা ধরনের যন্ত্র যা মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে আবার অনেক ক্ষেত্রে তা জটিলও করেছে।

প্রযুক্তির অপব্যবহার একজনকে নয়, একটি পরিবারকে, কখনও একটি সমাজকে বিপথগামী করছে, বিপদগ্রস্ত করছে, নিয়ে যাচ্ছে খাদের কিনারায়। বর্তমানে আগ্নেয়াস্ত্রকেও যেন হার মানিয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার।

গত শতকের শেষ থেকে ইন্টারনেট মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কেবল যোগাযোগ অনেক সহজ ও কার্যকর করে দিয়েছে তা নয়, বিশ্বকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়।

অন্তর্জালের (ইন্টারনেট) যুগান্তকারী প্রসারে সবাই আটকা পড়ে যাচ্ছেন মোহময় জালে। এই ‘জালে’ কে কোন চাল চালে তা বোঝা যায় না। খোলা বাতায়নে যেমন চুরির ভয়ও থাকে, সাগরে ফেলা জালে যেমন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত জিনিসও উঠে আসে তেমনি কোন অতিচতুর ব্যবহারকারী কোন

অসতর্ক ব্যক্তির অনেক ক্ষতিও করে ফেলতে পারে।
ইন্টারনেট বা অন্তর্জালের সুবিধা নিয়ে সৃষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের জীবনে সবার অলক্ষ্যেই অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। ভাল ফলের সঙ্গে অনেক মন্দ ফলও বয়ে আনছে।

বলতে পারেন, ভাল ফলই যদি হয় তবে আর কথা কেন? আসলে নিন্দুকেরা সব কিছুতেই দোষ খুঁজে বেড়ায়। একটা জিনিস বোধহয় মনে রাখা দরকার, তা হলো- কোন জিনিস কারও উপকারে না লাগলেও অসুবিধা নেই কিন্তু সেটি যদি উল্টো ক্ষতি করে তখন আপনি কি করবেন? নিশ্চয়ই তা

রাখবেন না। মাইনাস ওয়ান এর চেয়ে জিরো কি ভাল নয়?  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের অনেক উপকার করছে এটা ঠিক। কিন্তু বর্তমানে অপব্যবহারকারীদের দৌরাত্ম্যে এমন কিছু ক্ষতি ঘটছে সমাজে যা ওই উপকারকে হার মানিয়ে আমাদের মাইনাসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর এ

মাইনাসের অঙ্কটা ক্রমে বড় হচ্ছে বলেই কথা উঠছে এর উপযোগিতা নিয়ে। উদার ও অবাধ স্বাধীনতার ধারকরাও আজ আওয়াজ তুলছে ওইসব ক্ষতিকারক মাধ্যম বন্ধ করে দেয়ার। পর্নোগ্রাফির কথা যদি বাদও দেন তবুও। পর্নোগ্রাফিকে বিকৃত রুচির মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের খোরাক বলে

তা এড়িয়ে যান অনেকে। কিন্তু দেখা যাবে গোপনে তিনিও এর একজন ভোক্তা। এটা যারা করেন গোপনেই করেন। কিন্তু ফেসবুক ব্যবহার কোন গোপনীয় বিষয় নয়। সবার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে মার্ক জুকারবার্গের ফেসবুকই বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কারণ নামটার

মতো এর ব্যবহারও অনেক সহজ। আর এ কারণেই ফেসবুক নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। এ বিতর্ক এমনিতেই হয়নি। এর পেছনেও যথেষ্ট ভাববার বিষয় আছে।

বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা কমিশনে এক বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রীও দাবি করেছেন ফেসবুক বন্ধ করে দেয়ার। আহম মুস্তাফা কামাল কোন অশিক্ষিত মন্ত্রী নন। কোন সেকেলে ব্যক্তিও নন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান ছিলেন, ছিলেন আইসিসিরও প্রধান। তারপরও তিনি এর বিরুদ্ধে বলেছেন

কারণ তিনি দেখেছেন এর অপকারিতা। এই সম্প্রতি ক’টি ঘটনাই আপনাকে নাড়া দিবে। বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাসির হোসেন তার বোনের সঙ্গে একটি ছবি ফেসবুকে তুলে দেন। এর পরে তিনি নানাজনের নানা রকম অশ্লীল মন্তব্যও পান। এতে নাসির হোসেন ব্যথিত হন, ক্ষুব্ধ হন।

নাসির হোসেন ওই ছবিটি যদি না দিতেন তবে তার কি কোন ক্ষতি হতো? ফেসবুক না থাকলে তিনি দেয়ার কথা চিন্তাও করতেন না। ইদানীং অনেকেই অনর্থক তার স্ত্রীর সঙ্গে বা বান্ধবীর সঙ্গে ঘনিষ্ট ছবি সারা দুনিয়ার দেখার জন্য দিয়ে দিচ্ছেন। এতে আরেকজনকে প্রলুব্ধ করা ছাড়া আর কি ফায়দা

তিনি পেতে পারেন। যে কাজটা আগে আপনজনের সামনে করতেও ইতস্তত বোধ করতেন আজ তা বিশ্বকে দেখাতেও লজ্জা পায় না। দিন কি এতোটাই বদলেছে? আপনিই একবার ভাবুন আপনার বোনকে বা স্ত্রীকে জড়িয়ে যদি কেউ কোন খারাপ মন্তব্য করে তখন আপনার মানসিক অবস্থাটা কেমন

হবে। পৃথিবীর কোন প্রান্তের সুস্থ মস্তিষ্কের লোক কি এটা সহজভাবে মেনে নেয়? মাশরাফি বিন মুর্তজা এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তার ফ্যানপেজ বাংলাদেশের কোন ব্যববহারকারীর জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন।

আপনি বলবেন, সবাই তো আর খারাপ নন। কিন্তু কে খারাপ তা তো জানা যায় না। সবাই আর তো চোর বা ডাকাত নন। রাজধানীতে কয়েক লাখ পরিবারে কোটির বেশি লোকের বাস। আর চোর-ডাকাতের সংখ্যা কি লাখ হবে? তারপরও কেন সবাই দরজা বন্ধ করে, তালা এঁটে রাত যাপন

করেন। কয়টা ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনা ঘটে বছরে? কিন্তু তারপরও  লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রতিটি শাখায় ভল্ট তৈরি করতে হয়। আসলে নিরাপদ থাকতে চায় সবাই, আমিও- আপনিও। কোন ঝুঁকি নিতে চাই না কেউ আমরা। কিন্তু ইন্টারনেটের মাধ্যমে আপনার ঘরের মধ্যে যে চোর বা ডাকাত

ঢুকছে সে কিন্তু আপনার আর্থিক ক্ষতির চেয়েও মারাত্মক ক্ষতির কারণ ঘটাচ্ছে। তা নিয়ে কেন মাথা ঘামাবো না। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়ের সুবাদে আজ কতজন নারী তার সম্ভ্রম হারিয়েছে তার হিসাব কোন প্রতিষ্ঠান রাখছে কি-না জানি না। তবে যে পরিবারের মেয়েটি এর শিকার সে এবং

তার পরিবার কিন্তু আজীবন এ ক্ষত বয়ে বেড়াবে। বর্তমানে পরকীয়ার কারণে  যেভাবে সংসার ভাঙছে তার পেছনে এই ফেসবুক অনেকাংশেই দায়ী। স্মার্ট ফোনও দায়ী। এখন অনেক সুলভে মিলছে আধুনিক ফোন। এর মাধ্যমে ফেসবুক ব্যবহারও অনেক সহজ হয়েছে এবং এ সমাজকে আরও রসাতলে

নেয়ার জন্য যেন মোবাইল ফোন অপারেটররাও পাল্লা দিয়ে নেমেছে।
আমরা দাবি করি আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। আমাদের লেখাপড়ার হার বেড়েছে, আয় বেড়েছে, জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। আমরা খতিয়ে কি

দেখেছি যে, এই বাড়ার হার কতটুকু? কতজনের বেড়েছে?  আমরা কথা-বার্তায় বা খোল নলচে বদলে যত দ্রুত নিজেদের আধুনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছি বা আধুনিক বলে দাবি করছি গোটা দেশের মানুষ কি তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যেতে পারছে? আইনের দুর্বলতায় অপরাধ বাড়ে। আর

মূল্যবোধের অবক্ষয়ে চরিত্রের দুর্বলতা বাড়ে। কেউ যখন তার চারপাশে আলো ঝলমলে চাকচিক্য দেখে সে তখন তার নিজেকে ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সেওতো সমাজেরই অংশ। খারাপ জিনিসে প্রলুব্ধ হলে বা কেউ কোন কারণে নিজেকে বঞ্চিত ভাবলে তার মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়বেই। আর এতে সমাজের শান্তিও নষ্ট হয়। আর আমাদের সবার আসল লক্ষ্যই তো শান্তিপূর্ণ সমাজ, শান্তিপূর্ণ দিনযাপন। যত ভালই খান, ভোগ করেন- শান্তিই আসল।