মরীচিকার পেছনে ছুটে চলা

Print Friendly, PDF & Email

আমার এক পরিচিতজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটেছে’। কেন এই পরিবর্তন ঘটছে তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি কয়েক দিন আগের একটি ঘটনা দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরলেন।

তিনি তার লেনদেনের কাজে রাজধানী ঢাকার কাকরাইলের একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা অফিসে নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন। তিনি ব্যাংকের যে ডেস্কে যান একদিন গিয়ে দেখেন সে ডেস্কের দুটি চেয়ারে দুজন বসে আছেন।

দেখে মনে হলো তারা দুজন সম্পর্কে মা-ছেলে হবে। ছেলের বয়স পনের থেকে ষোল’র বেশি হবে না। বয়সে অনেক সিনিয়র হওয়ার পরও মুরব্বি হিসেবে একটি চেয়ার ছেড়ে দেয়ার মতো সৌজন্যটুকুও দেখালো না মা-ছেলের কেউই।

সেই ডেস্কে তৃতীয় কোন চেয়ারও নেই। এমনকি মাও ছেলেকে বলার তাগাদা অনুভব করল না যে,  মুরব্বিকে বসার জন্য একটি চেয়ার ছেড়ে দেয়ার। পরিচিতজন আফসোস করে বললেন, ‘আমাদের ছোটবেলায় এটা কী সম্ভব ছিল। তখন বড়দের সামনে ছোটদের চেয়ারে বসাকে দুষণীয় হিসেবে দেখা হতো।’

আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, সময়ের বিবর্তনে মানুষের মূল্যবোধে পরিবর্তন তো ঘটবেই। এতে বিচলিত হলে নিজেকে কষ্ট দেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে ভারতের বিখ্যাত মনীষী নীরদচন্দ্র চৌধুরী’র একটি কাহিনির কথা মনে পড়ে গেলো।

তিনি এ কাহিনিটি তাঁর ‘আমার দেবোত্তর সম্পত্তি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “বিলাতে আসিবার অল্প কিছুদিন আগে আমি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা দিতে গিয়াছিলাম, তাহাতে বলিয়াছিলাম বাঙালির আদর্শপরায়ণতা লোপ পাইতেছে।

বক্তৃতার শেষে পাঞ্জাবি অধ্যাপক, যিনি সভাপতিত্ব করিতেছিলেন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি এই কথা বলিলাম কেন? আমি উত্তর দিবার আগেই একটি বাঙালি যুবক আমার কাছে আসিয়া সহাস্যমুখে একটু অবজ্ঞাভরেই বলিল, I don’t care for faith and ideals. I shall be quite happy if I get a job  (আমি বিশ্বাস ও আদর্শের পরোয়া করি না।

আমি একটি চাকরি পেলেই সুখি হব)। আমি সভাপতি মহাশয়ের দিকে ফিরিয়া বলিলাম, Now you understand  (এখন বুঝছেন?)?”
নীরদচন্দ্র চৌধুরী  বর্ণিত ঘটনাটি আজ থেকে ৪৫-৫০ বছর আগের।

এর আগ থেকেই সমাজে পরিবর্তনের সূচনা শুরু হয়েছে। আসলে সভ্যতা যতই আধুনিক হচ্ছে ততই মানুষ ভোগ-বিলাসিতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বহুদিনের লালিত মুল্যবোধ, আদবকায়দা এ ভোগ-বিলাসিতার কাছে এখন একেবারে নস্যি।

এসব এখন সেকেলে প্রাচীন বলে পরিত্যক্ত পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই’। আমরা যারা অতি আধুনিক সভ্যতার অধিবাসী তাদের অধিকাংশই এখন আসল হরিণ রেখে সোনার হরিণের পিছু ছুটছি। এ কারণে ভুলে যাচ্ছি

আমাদের হিরন্ময় অতীত, আমাদের গৌরব, আমাদের বীরত্বগাথা এবং সেইসঙ্গে আমাদের মূল্যবোধ। আমাদের বাপ-দাদারা যা কিছু নিয়ে অহঙ্কার করতেন সেসব কিছু আমাদের কাছে বাতিলের পর্যায়ে। আর সেজন্য আমরা দিন-মাস-বছরব্যাপী দিকচক্রবাল ছুটছি তো ছুটছি। পেছনের দিকে ফিরে

তাকানোর সময় কোথায়। সোনার হরিণ যদি পেয়ে যাই, তাহলে চুলোয় যাক মূল্যবোধ আর সেকেলে আদব-কায়দা! কিন্তু আসলে তো আমরা ছুটছি মরীচিকার পেছনে। এ আসল নয় এ মায়া! মনীষীরা এর কারণ হিসেবে বলেন, ‘গোড়ায় গলদ’। এই গোড়াটা হচ্ছে শিক্ষা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন

মানুষ উৎপাদন না করে চাকরিপ্রার্থী উৎপাদন করছে। আমাদের ছোটবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’, ‘সদা সত্য কথা বলিবে’, ‘বড়দের সম্মান কর’, ‘মানুষকে ভালবাসলে আল্লাহকে ভালবাসা হয়’, ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ ইত্যাদি আপ্ত বাক্যগুলো মুখে মুখে পড়ানো হতো। পরে

হাতের লেখা খাতায় বার বার লিখতে হতো। এই বাক্যগুলো বার বার লিখতে গিয়ে ছোট শিশুদের মনের মধ্যে গেঁথে যেতো। এই শিশুটিই যখন বড় হতো, তখন তার মধ্যে ওই বাক্যগুলোর প্রভাব কাজ করতো। এই প্রভাবের কাজটি চলতো আমৃত্যু। সুতরাং এ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তির দ্বারা

খারাপ ও অনৈতিক কাজ সংঘটিত হওয়া অসম্ভবই হতো। কিন্তু এখন কী আর এসব বাক্য পড়িয়ে শেষে হাতের লেখার জন্য দেয়া হয়। আমাদের সবার ছেলে-সন্তানেরা স্কুলে যায়। কৈ, এমন হাতের লেখার খাতা তো দেখি না।

সমাজের সবকিছুই পরিবর্তনশীল। পরিবর্তন ছাড়া অগ্রগতি আশা করা যায় না। কিন্তু সমাজের কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোতে পরিবর্তন হবে ইতিবাচক। তেমনি একটি বিষয় হচ্ছে মূল্যবোধ। দীর্ঘদিনের ব্যবধানে মানুষের মধ্যে যেসব মূল্যবোধ গড়ে ওঠেছে যেমন, বড়দের সম্মান করা,

ছোটদের স্নেহ করা ইত্যাদিতে পরিবর্তন আসবে আরও শানিত করার জন্য। এগুলোতে পরিবর্তন আসার অর্থ কী এই যে, এগুলোকে বাদ দিতে হবে?